
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন ঘিরে রোববার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই শুনানি চলাকালীন বিচারকের উপস্থিতিতেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা হট্টগোল ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতির চাপে বিচারক একবার এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যেতে বাধ্য হন। পরে বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে বিচারক পুনরায় এজলাসে ফিরে শুনানি গ্রহণ করেন, যদিও তখনও দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তর্কাতর্কি ও পোশাক টানাটানি চলতে থাকে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বেলা ২টা ৪১ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন।
বিমানবন্দরে ট্রলি ও লাগেজ সংকট নিয়ে বিশৃঙ্খলা, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় গত শুক্রবার মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এক দিনের রিমান্ড শেষে আজ তাঁকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন জানায় পুলিশ। এর বিপরীতে আসামিপক্ষ তাঁর জামিনের আবেদন জানায়। এই জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করেই মূলত আদালতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়। আদালতে নিজের পক্ষে শুনানির জন্য ১০ জন আইনজীবীকে অনুমতির আবেদন জানান আখতারুজ্জামান নিজেও।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বিমানবন্দর থানার উপপরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম আদালতকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে এবং তদন্তের স্বার্থে তাঁকে জেলহাজতে রাখা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে আসামি বিমানবন্দরে অসংলগ্ন আচরণ করেছেন। তিনি এটিকে প্রতিবাদ হিসেবে মানতে নারাজ, বরং একে অপরাধ বলে অভিহিত করেন। পিপি এ সময় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে কিছু কড়া মন্তব্য করেন, যা নিয়ে আদালতকক্ষে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ঘটনার জন্য একপক্ষ আরেকপক্ষকে দোষারোপ করেছে। আসামির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তকার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ওই আসামিকে জেলহাজতে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন। বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামানের সঙ্গেই অবিচার হয়েছে, অন্যায় হয়েছে দাবি করে এই আইনজীবী আদালতকে বলেন, শুধু তিনিই নন, এই ভোগান্তির শিকার হয়েছেন আরও অনেকেই। তাঁর যে আচরণের বিষয়ে মামলা হয়েছে, মূলত সেটি তাঁর প্রতিবাদ।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক পাল্টা যুক্তিতে বলেন, আখতারুজ্জামান একজন সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বিমানবন্দরে যা করেছেন তা ছিল অনিয়মের বিরুদ্ধে একজন সচেতন নাগরিকের প্রতিবাদ। ভিডিওতে যা দেখা গেছে তা তাঁর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন বলে আদালতকে জানান এবং যেকোনো শর্তে জামিন প্রার্থনা করেন। জামিন শুনানিতে আইনজীবীদের বাগ্বিতণ্ডার সময় পিপির বক্তব্যকে ‘বাতিল মাল’ বা ‘মধু খাওয়ার’ মতো ভাষায় সমালোচনা করা হয়, যা দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে বিচারকের অনুমতি নিয়ে আখতারুজ্জামান আদালতকে বলেন, ‘আমার পক্ষে ১০ জন আইনজীবী শুনানি করবেন। ১০ জনকেই হেয়ারিং করার অনুমতি প্রার্থনা করছি।
উল্লেখ্য, গত বছর ডিসেম্বরে বিএনপি থেকে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন আখতারুজ্জামান। ফলে আজ তাঁর পক্ষে জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। বিচারক এজলাসে প্রবেশের আগেই আদালতকক্ষে দাঁড়ানোর জায়গা নিয়ে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সঙ্গে তাঁদের বিরোধ শুরু হয়। শুনানির শেষ পর্যায়ে বেলা ৩টা ৮ মিনিটে আবারও হট্টগোল শুরু হলে বিচারক উপস্থিত আইনজীবীদের শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন।
দীর্ঘ শুনানির পর আদালত আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় তাঁকে আদালত থেকে বের করার সময় ভবনের নিচতলায় আবারও দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পুলিশ এক পর্যায়ে আখতারুজ্জামানকে সিঁড়িতেই দাঁড় করিয়ে রাখে।
ঘটনার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী সংবাদ ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করেন যে, জামায়াত সব জায়গায় ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক পাল্টা জবাবে বলেন, তাঁরা বাইরে থেকে কোনো লোক আনেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ৩৫ হাজার আইনজীবীর মধ্যে যেকোনো পক্ষেরই অসংখ্য সমর্থক বা মক্কেল থাকতে পারেন, তাই বাইরের লোক তকমা দেওয়াটা অযৌক্তিক। পুরো ঘটনায় আদালত চত্বরে দীর্ঘ সময় ধরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.