
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ থেকে সরে এসে সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বিশাল সব ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাত সেই উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্য এখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো। পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।
প্রায় ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে ইয়েমেনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে রিয়াদ। যদিও সামরিকভাবে হুতিদের মোকাবিলায় রিয়াদ দীর্ঘসময় অতিবাহিত করেছে, তবে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, চলতি গ্রীষ্মে সংঘাত নতুন করে দানা বাঁধে এবং গত মাসে তা চরম আকার ধারণ করে। এই অস্থিরতা এখন ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থার পর চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। গত মাসে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের কৌশলগত কিছু ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান সময়ে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে দীর্ঘদিনের জোটে ফাটল এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত বছর ইয়েমেনে ইউএইর সামরিক যানবহরে সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলার ঘটনা দুই মিত্রের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে আবুধাবি তাদের সেনা সরিয়ে নেয়। ইউএইর দক্ষ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিকল্প রিয়াদ এখনো তৈরি করতে না পারায় ওই অঞ্চলগুলোতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা হুতিদের আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছে। একসময় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি আরব ও ইউএই ইয়েমেনে একসঙ্গে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল।
দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইউএইর সেনারা দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করেনি। এর ফলে মাঠপর্যায়ে লড়াই করা হাজারো যোদ্ধা সৌদি আরবের বর্তমান নতুন কৌশলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিল করেছে এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২২ সালের পর এটিই ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে স্বীকৃত। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি মনে করেন, হুতিদের এই আকস্মিক ও উন্নত ড্রোন হামলার জন্য সৌদি আরব পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। তাদের কাছে থাকা অত্যাধুনিক অস্ত্র সৌদি আরবের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম। একই সাথে সৌদি-সমর্থিত স্থানীয় বাহিনীর সাথে যথাযথ সমন্বয়ের অভাব এবং কৌশলগত অঞ্চল হারানোর ফলে তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকেও রিয়াদের একটি বড় ভুল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং 'মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই' মর্যাদা পাওয়ার পরও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় রিয়াদ হতাশ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার ফোনালাপ করেছেন। সেখানে তিনি হুতিদের দমনে সহায়তার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প সরাসরি কোনো সামরিক সম্পৃক্ততায় রাজি হননি। ওমানের মাধ্যমে হুতিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি রক্ষার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। পাশাপাশি সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কতটা পাশে থাকবে, তা নিয়েও রিয়াদের মূল্যায়নে ভুল ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, সৌদি সামরিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই এককভাবে যুদ্ধ পরিচালনা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এখন সবকিছুই অনেকটা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ইতিমধ্যে সৌদি আরবে হুতি হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন এবং চারজন বাংলাদেশি নাগরিক আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন; এছাড়া প্রায় তিন হাজার প্রবাসী ঢাকায় আটকা পড়েছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াদ এখন বহুপক্ষীয় সহায়তার চেষ্টা করছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক এবং ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা চলছে। সামরিক দিক থেকে ফ্রান্স সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে, যুক্তরাজ্য জ্বালানি সরবরাহে উড়োজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে এবং শতাধিক মার্কিন উপদেষ্টা গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করছেন।
গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাইরের সাহায্য বা সাময়িক সামরিক বিজয় ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি মনে করেন, কমান্ড সেন্টারগুলোকে একীভূত করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি পুনর্দখল করা অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা না যায়, তবে এই সামরিক উদ্যোগগুলো শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
ইয়েমেন ইস্যুটি যে সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বড় ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ, সেটিও স্পষ্ট। ইরান সৌদি আরবকে চাপে রাখতে হুতিদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে পারে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে নিজস্ব কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে, অন্যদিকে হুতি নেতৃত্বকে দুর্বল করতে সামরিক অভিযান জোরদারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত থেকে মুক্তি পেতে রিয়াদের সামনে কোনো সহজ পথ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.