
শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণ এবং তাদের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোই যেন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানের আসল আনন্দ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের এই অধ্যাপক ও ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন। তার এই মানবিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মতৎপরতা তাকে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠ শেষ হলেও তাই তার শিক্ষকতা থেমে থাকে না। শিক্ষাক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিও মিলেছে। শ্রেণিকক্ষেও তার পাঠদানের ধরন কিছুটা আলাদা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাটাগরিতে তাকে ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। গত সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত সরকারি এই অনুষ্ঠানে তার হাতে সম্মাননাপত্র ও ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ড. বাহানুর বলেন, সরকার কর্তৃক এমন স্বীকৃতিতে তিনি গর্বিত ও আনন্দিত। এটি তার দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ প্রচেষ্টা এবং সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব, যা দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে সহায়ক হবে।
শিক্ষক হিসেবে তার দীর্ঘ পথচলার শুরুটা ছিল ১৯৮৭ সালে, যখন তিনি বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৯১ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর জাপান থেকে পিএইচডি এবং তাইওয়ান ও জার্মানি থেকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করে ২০০৫ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। তবে তার এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে শৈশবের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি। ১৯৭১ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি বাবাকে হারিয়েছিলেন। সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার ফলে শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্ব ও সংকট তিনি নিজের অভিজ্ঞতার আলোকেই উপলব্ধি করতে পারেন। তবে তার শিক্ষক হয়ে ওঠার গল্প শুধু ডিগ্রি, গবেষণা কিংবা পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
শ্রেণিকক্ষে ড. বাহানুরের পাঠদান পদ্ধতিতেও রয়েছে স্বকীয়তা। তিনি ক্লাসের মূল বিষয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সময়ের গুরুত্ব, শৃঙ্খলা, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেন। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেওয়া তার নিয়মিত কাজের অংশ। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সংকটে তার সহযোগিতার নজির অনেক। করোনার সময় এক শিক্ষার্থীর চরম অর্থকষ্টের খবর পেয়ে তিনি তাকে চাকরি জুটিয়ে দেওয়া এবং গবেষণায় উৎসাহিত করার মতো উদ্যোগ নেন। একইভাবে, চাকরির অনিশ্চয়তায় থাকা এক এতিম ছাত্রীকেও তিনি কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়ে বিসিএস ক্যাডার হতে প্রেরণা জুগিয়েছেন। শিক্ষার্থীর সাফল্যে তিনি যেমন আনন্দ পান, তেমনি কোনো শিক্ষার্থী বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ান।
গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিতেও তার অবদান অনস্বীকার্য। ২০০২ সাল থেকে তিনি মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, যেখানে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা গভীর রাত পর্যন্ত গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, ভ্যাকসিন, প্রোবায়োটিক ও হাঁসের ডাক প্লেগ নিয়ে নিয়মিত গবেষণার পাশাপাশি তিনি কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নমুখী গবেষণায় গুরুত্ব দেন। এছাড়া ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপ ও এক্সটার্নশিপ কার্যক্রম পুনরায় চালু করেছেন। গবেষণাগারগুলোকে আরও আধুনিকায়নের মাধ্যমে উদ্ভাবনী শিক্ষা প্রসারে তিনি নিয়মিত তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। সাহস জোগান স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যেতে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.