
বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই। গত রোববার সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায় এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে দেখা হচ্ছে। ১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পীর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান এবং দাদা খান বাহাদুর আবদুল জলিল খানের পরিবারে সংস্কৃতিমনা পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠা। কামরুন্নেসা স্কুলে পড়ার সময় থেকেই নাচের তালিম নেওয়া নাসিমা মাত্র ১২ বছর বয়সে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন। পরিবারের আপত্তির মুখে বড় চাচার সমর্থন নিয়ে তিনি অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেন। স্বামী একজন অতিথিকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে গেছেন।
নাসিমা খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কার বউ’ সিনেমার শুটিং। সেসময় পরিচালক নজরুল ইসলামের নির্দেশ ছিল, স্বামীর সড়ক দুর্ঘটনার খবর শুনে চিৎকার দিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যেতে হবে। কিন্তু দৃশ্যটি ধারণের সময় কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই পেছন থেকে তাঁকে আচমকা জোরালো ধাক্কা দেওয়া হয়। এতে তিনি সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে যান এবং মারাত্মক আঘাত পান। পরবর্তী তিন দিন তিনি ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারেননি। অথচ ক্যামেরার পেছনে থাকা কলাকুশলীরা দৃশ্যটি নিখুঁত হওয়ায় উল্লাস করছিলেন। ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী তাঁকে ‘ওয়েল ডান’ বলে প্রশংসা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানিয়েছিলেন, সেসময় শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পারিবারিক সম্পর্ক বেশি ছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়লেন নিচে। সেসব স্মৃতির মধ্যেই রয়েছে ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ের এ ঘটনা। বিয়ের দিন এক দুর্ঘটনার পর নায়িকা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন।
১৯৯০ সালে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখনে প্রকাশিত নিজের আত্মকথনে নাসিমা খান অভিনয়জীবনের নানা অজানা তথ্য তুলে ধরেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণায় উঠে আসে ‘কার বউ’ ছবির বিভিন্ন মজার অভিজ্ঞতার কথা। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম দিককার হাসির চলচ্চিত্রগুলোর একটি, যেখানে হারুন, গোলাম মুস্তাফা ও সুভাষ দত্তের মতো অভিনেতারা তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ের শুরুর দিকে ১৯৬২ সালে মুক্তি পাওয়া সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ ছবিতেও তিনি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। একটি বিশেষ দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে ১২ থেকে ১৪ বার চেষ্টার পর তিনি পরিচালকের চাহিদা অনুযায়ী অভিনয় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন, যা পরবর্তীতে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। পরিচালকের নির্দেশমতো দৌড় দিলেন নায়িকা। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা পরে পুনঃপ্রকাশ করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)।
১৯৫৯ সালে অভিষেক হওয়ার পর ‘তানহা’ ও ‘যে নদী মরুপথে’র মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শক সমাদৃত হয়। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে ১৯৭৫ সালে তিনি চলচ্চিত্র জগতের বাইরের একজনকে বিয়ে করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে আবারও পর্দায় ফিরে আসেন তিনি। তবে জীবনের শেষ অধ্যায়টি তাঁর জন্য বেশ যন্ত্রণাদায়ক ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন। বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও, ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল গত ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। নিখোঁজ সন্তানকে ফিরে পাওয়ার প্রবল আকুতি ও দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েই চিরবিদায় নিলেন এই প্রবীণ অভিনেত্রী।





