৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চাকরির পেছনে না ছুটে ডেইরি ফার্মে সফল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার

Published: October 23, 2026, 3:39 pm

কিশোরগঞ্জের ভৈরব শহরের রমজান মিয়ার হাউলি এলাকার ফজলুর রহমানের ছেলে ইয়াসিন আরাফাত। জাতীয় বস্ত্রপ্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করলেও তিনি গড়পড়তা চাকরির পথে হাঁটেননি। বরং ২০১৮ সালে মাত্র চারটি গাভি নিয়ে পাশের উপজেলা কুলিয়ারচরের ফরিদপুর গ্রামে শুরু করেন ‘বস এগ্রো ফার্ম’। বর্তমানে তার সেই ছোট্ট খামারটি দেড় শতাধিক গরুর বিশাল এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গরুর খামার করে সফল হয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসিন আরাফাত। এই তরুণ সফল খামারি ও শিল্প উদ্যোক্তা ইয়াসিন আরাফাত জানান, সফলতার জন্য শুধু অভিজ্ঞতা নয়-দক্ষও হতে হবে।

তার খামারের সফলতা কেবল গরু পালনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্তমানে খামারে ৩০-৩৫টি দুগ্ধবতী গাভি রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। এই দুধের সিংহভাগ ব্যবহার করে তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুরে দই ও ঘি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন। বিএসটিআইসহ সরকারি নিয়ম মেনে তার উৎপাদিত পণ্য এখন ভৈরবসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও সমাদৃত। কোরবানির ঈদের সময় তিনি শতাধিক পশু প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ করেন, যা স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সংগত কারণেই তার কাজ করার কথা ফাইবার, সুতা, কাপড় এবং পোশাক তৈরির প্রযুক্তির নানা বিষয় নিয়ে। আর এই ভিন্ন পেশায় গিয়েও সফলতা পেয়েছে দারুণভাবে। প্রথমে এই দুধগুলো বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করলেও, বর্তমানে তিনি ভৈরবের জগন্নাথপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন দই ও ঘি তৈরির কারখানা। এরমধ্যে ৩০-৩৫টি দুগ্ধ গাভি আছে। এতেও তার বেশ একটা লভ্যাংশ থাকে বলে জানান তিনি। বিএসটিআইসহ সব রকমের সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে সেই দই ও ঘি বাজারজাত করছেন ভৈরবের আশপাশের জেলা-উপজেলাসহ প্রায় সারা দেশে। ব্যাপক সাড়া ফেলেছে তার উৎপাদিত ‘বস’ দই ও ঘি। দেশীয় প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানোর মাধ্যমে পশুগুলো লালিত পালিত হয় বলে তার খামার থেকে পছন্দের পশুটি কিনে নিয়ে যান আশপাশের ক্রেতারা। এসব থেকে আহরিত ফলফলাদি পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন হচ্ছে। যাতে তাদের বিদ্যুতের সমস্ত চাহিদা পূরণ হয়ে যায় বলে জানালেন তিনি। তারা খামারের যত্ন-পরিচর্যা ছাড়াও দই, ঘি তৈরি ও প্যাকেজিং কাজ করে থাকেন।

উদ্যোক্তার কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয়েছে আরও নানা উদ্যোগ। খামারের দেড় একরের পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি হাঁস ও দেশি মুরগি পালন করছেন তিনি। এছাড়া খামারের আঙিনায় রোপণ করা হয়েছে লেবু, আম, জাম ও কলার মতো নানা ফলের গাছ। খামারে উৎপন্ন গোবর দিয়ে নির্মিত বায়ুগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে পরিবারের রান্নার প্রয়োজন মিটিয়ে ভবিষ্যতে জেনারেটর চালনার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। যার প্রায় ৭০ শতাংশই তার ফার্মে উৎপন্ন। তাই ভবিষ্যতে তিনি এই প্ল্যান্টটি আরো সম্প্রসারিত করে গ্যাস দ্বারা চালিত জেনারেটর তৈরি করবেন।

বর্তমানে ইয়াসিনের খামার ও কারখানা মিলে অর্ধশত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। সফলতার মূলমন্ত্র হিসেবে তিনি মনে করেন, দক্ষতা ও নিষ্ঠার পাশাপাশি এই পেশার প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা জরুরি। আবেগ ও মমতা দিয়ে কাজ করলে এই সেক্টরে অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। ভবিষ্যতে খামারটি আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করে গ্রাহকদের মানসম্মত পণ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। শুধু নিজেই সফল হননি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন শত শত মানুষের। তিনি খামারকে একটি সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এখানে কেউ আসতে চাইলে এই সেক্টরকে ভালোবাসতে হবে। এদিকে তার এই খামার এবং কারখানায় দক্ষ-অদক্ষ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। যে যে কাজে দক্ষতা অর্জন করবে, সে সেক্ষেত্রে ভালো করবে। আবেগ দিয়ে, মায়া দিয়ে কাজ করতে হবে।

ইয়াসিন আরাফাতের এই অর্জনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শাহীনুল হক। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষিত হয়েও একজন তরুণ এমন দৃষ্টান্তমূলক সফলতা দেখিয়েছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তার মতো শিক্ষিতরা এগিয়ে এলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত সমৃদ্ধ হবে। এদিকে ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের প্রভাষক মনোয়ারা পারভীন বলেন, দুধ, মাংস ও ডেইরি পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ করে তিনি দেশীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন, যা প্রশংসার দাবি রাখে।