
সামান্য অসুস্থতা, শারীরিক দুর্বলতা বা হালকা ব্যথার অজুহাতে বর্তমানে মসজিদে চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক মসজিদে চেয়ারের দীর্ঘ সারি দেখা গেলেও শরীয়তের দৃষ্টিতে সবার জন্য চেয়ারে বসে নামাজ পড়া বৈধ নয়। সালাতে সিজদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন বা স্তম্ভ। হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) সাতটি অঙ্গ দ্বারা সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছেন—কপাল (নাকের অংশসহ), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলসমূহ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৮১২)। এই সাতটি অঙ্গ সঠিকভাবে ব্যবহার করে সমতল ভূমিতে সিজদা করলেই তা পরিপূর্ণ রূপ পায়। এছাড়া ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে, তা না পারলে বসে এবং তাও না পারলে শুয়ে সালাত আদায় করবে (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১১১৭)। মনে রাখা দরকার, যেকোনো অসুস্থতার কারণে চেয়ারে বসে সালাত আদায় করা যায় না। এর যথাযথ প্রতিফলন হয় সমতলে সিজদা অবস্থায়। নতুবা ক্ষেত্রবিশেষে সালাত সহিহ নাও হতে পারে। কারণ, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সালাতের যেই লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, চেয়ারে বসে সালাত আদায়ে তার প্রতিফলন হয় না। এমনকি সালাতের বিধানসমূহও যথানিয়মে আদায় হয় না। পা ছড়িয়ে, চারজানু হয়ে বা এক পা বিছিয়ে আরেক পা উঠিয়ে কিংবা এক পায়ের পাতা বিছিয়ে আরেক পা বের করে অথবা উভয় পা বের করে বা অন্য যেকোনো পদ্ধতিতে জমিনে বসতে পারলেই হলো। এ অভিমত যদিও একেবারে দলিলবিহীন নয়, কিন্তু দলিলের বিচারে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর শাগরেদ ইমাম যুফার ইবনে হুযাইল (রহ)-এর অভিমত বেশি শক্তিশালী মনে হয়। আর এটাই ইমাম মালেক, ইমাম শাফি’ঈ এবং ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ। এই বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করতে পারলে মসজিদগুলোতে চেয়ারের সংখ্যা হ্রাস পাবে। সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর গোলামি করা যাদের কাম্য, আশা করি তারা বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত কিছু আরোপ করেন না’ (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)। অসুস্থতার ক্ষেত্রে শরীয়তে শিথিলতা থাকলেও অক্ষমতার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। অক্ষমতা বলতে কাজের সামর্থ্য না থাকা, দাঁড়ালে বা সিজদা করলে মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি, রোগ বৃদ্ধি বা নিরাময় দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা এবং তীব্র অসহ্য ব্যথাকে বোঝায়। তবে কেবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। ইমাম ইবনুল হুমাম (র.) জানান, রোগ বৃদ্ধি বা নিরাময়ে বিলম্বের বিষয়টি জোরালো প্রমাণ, রোগীর পূর্ব অভিজ্ঞতা কিংবা একজন মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে নিশ্চিত হতে হবে (ফাতহুল কাদির, ২য় খণ্ড, ৩৫১)। ফলে সামান্য অসুস্থতায় শরয়ি পরামর্শ বা নির্ভরযোগ্য ফতোয়া ছাড়াই চেয়ারে বসা অনুচিত। যখন যেটি আদায়ে অক্ষম হবে, তখন মা’জুর হিসেবে কেবল সেটি না করলে চলবে। রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার এবং তা নিরাময়ে বিলম্ব হওয়ার বিষয়টি কীভাবে নির্ণয় হবে, এর মূলনীতিও ফিকহ বিশেষজ্ঞগণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। চেয়ারে বা উঁচু কিছুতে বসে সালাত শুরু করার পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শের পাশাপাশি নিজের অবস্থার পুরোপুরি বিবরণ দিয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ আলেম বা ফাতওয়া বিভাগ থেকে মাসআলা জেনে নিলে ভালো হয়। এর জন্য সামনে তক্তা বা টেবিল বা সামনে কিছু রেখে তাতে সিজদা করার প্রয়োজন নেই। এতে মতভিন্নতার কোনো একটিকে অকাট্য বলার সুযোগ নেই। আয়াতুল কুরসি নামে আল কোরআনে একটি আয়াত রয়েছে। যে কঠিন শর্তে সালাতে চেয়ার ব্যবহারের অনুমতি আছে, সে ক্ষেত্রেও যদি উঁচু মোড়া, টুল ইত্যাদি ব্যবহারে কাজ হয়, সে ক্ষেত্রে চেয়ার ব্যবহার না করাই ভালো।
যেসব ক্ষেত্রে বা যাদের জন্য চেয়ারে বসে সালাত আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়, তার তালিকা নিচে উল্লেখ করা হলো
উল্লেখ্য যে, ফরজ সালাতের ক্ষেত্রে দাঁড়ানো (কিয়াম) এবং সঠিকভাবে সিজদা করা আবশ্যকীয় রুকন। তবে নফল বা সুন্নাত সালাতের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম শিথিল থাকে। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরকালে বাহনের ওপর বসে ইশারায় নফল ও বিতর সালাত আদায় করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১০০০)। তাই মূল ফরজ ও ওয়াজিব সালাতে শরয়ি ওজর বা প্রকৃত অক্ষমতা না থাকলে চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। সিজদার পদ্ধতি সম্পর্কে বিশুদ্ধ হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইব্নু আব্বাস (রা। সালাতের অন্যান্য ফরজ-ওয়াজিব আমলের বিধানও এমনই। সফরে তাঁর সাওয়ারি হতেই ইঙ্গিতে রাতের সালাত আদায় করতেন, সাওয়ারি যেদিকেই ফিরুক না কেন।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.