
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিক লানা নুসায়বেহর প্রার্থিতাকে সমর্থন করার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য মহাসচিব পদে নুসায়বেহর প্রার্থিতাকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রিমিয়ার লিগের এসব পদক্ষেপের’ কারণে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাতিল করার হুমকি দিয়েছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল যখন অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের কিছু অংশ সংযুক্ত করার কথা বিবেচনা করছিল, নুসায়বেহ তখন বলেছিলেন, আরব আমিরাত সব সময় এসব চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছে। তিনি ইসরায়েল সরকারকে তাদের পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান জানান। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, এখন জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার সময়।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্য এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বলে সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে লন্ডন এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা দেয়নি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটগুলো মোকাবিলায় সক্ষম এমন একজন যোগ্য ও উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজছে যুক্তরাজ্য। নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও, যোগ্যতার মাপকাঠিকেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছে।
৪৮ বছর বয়সী লানা নুসায়বেহ নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একইসঙ্গে তিনি মিসরের বুট্রোস বুট্রোস–ঘালির পর দ্বিতীয় আরব মহাসচিব হওয়ার পথে রয়েছেন। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদকে সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে হবে, তবে ভেটো ক্ষমতার অধিকারী পাঁচ সদস্যের মধ্যে সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে হবে। তবে তার আগেই পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণকারী নুসায়বেহ ইউনেসকোর পরামর্শক ও গলফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৩ সালে নুসায়বেহ জাতিসংঘে আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি নিযুক্ত হন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, ‘ইউএন উইমেন’ নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি ও দুবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জর্ডান সরকার যখন পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম নিয়ন্ত্রণ করত, তখন তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং যুক্তরাজ্যে জর্ডানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছেন। শিন্ডলার বলছেন, ২০২০ সালে ‘জুয়িশ ক্রনিকল’-এর একটি কলামে লিখেছিলেন, নুসায়বেহ ইসরায়েলি গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছিলেন। শিন্ডলার উল্লেখ করেন, নুসায়বেহ ‘জায়নবাদ এবং ইসরায়েলের ইতিহাসের ওপর চমৎকার ও সূক্ষ্ম কিছু প্রবন্ধ’ লিখেছিলেন এবং ‘আব্রাহাম চুক্তি’ নামে পরিচিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে তাঁকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো একাধিক নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আরএসএফ দারফুরে অ-আরব জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধনসহ নানা অপরাধ ঘটিয়েছে।
নুসায়বেহর এই প্রার্থিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। দেশটির বিরুদ্ধে আরএসএফ বা ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’-কে সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হত্যাকাণ্ডে গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ বিদ্যমান। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নুসায়বেহ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে আসছেন।
যুক্তরাজ্য সরকার সুদানের এসএএফ ও আরএসএফ বাহিনীর ১৫ জন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ নানা নৃশংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, দারফুরের আল ফাশারে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়ের দায়ভার সুনির্দিষ্টভাবেই যুদ্ধরত পক্ষগুলোর। তিনি আরও বলেন, যারা প্রকাশ্যে এই পক্ষগুলোকে সহায়তা করছে, তাদের সহায়তা বন্ধ হওয়া উচিত। মিলিব্যান্ড বলেন, ‘এগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ইসরায়েলের সঙ্গে আরব আমিরাতের কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণেও নুসায়বেহর প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
তিনি বংশসূত্রে ফিলিস্তিনি এবং জেরুজালেমে তাঁর পরিবারের শেকড় রয়েছে।
তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন জর্ডানের প্রখ্যাত মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত। ওই সময় ইসরায়েল–বিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক কলিন শিন্ডলার তাঁর শিক্ষক ছিলেন।
নুসায়বেহ নিজে যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং ইসরায়েলি গবেষণার ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
তাঁকে ‘আব্রাহাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবশালী অনুঘটক হিসেবে দেখা হয়।
যদিও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি পদক্ষেপের সময় তিনি ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে এবং চুক্তি স্থগিতের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।
এই কূটনৈতিক চালে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণও যুক্ত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের মালিক আমিরাতি রাজপরিবারের সদস্য শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান। ক্লাবের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের তদন্তের জেরে দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন চলছে। নুসায়বেহকে সমর্থন জানানো আবুধাবির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি কৌশল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে নিজের প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়ে নুসায়বেহ জানান, বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান মতপার্থক্য ঘুচিয়ে ঐক্যবদ্ধ ফলাফল নিয়ে আসার লক্ষ্যেই তিনি কাজ করতে চান। বিগত মাসে এক তদন্তে উঠে এসেছে, ক্লাবটি ৮ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের (১১ কোটি ডলার) বেশি অবৈধ অর্থায়নের তথ্য গোপন করে প্রিমিয়ার লিগের ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গ করেছে। গত সপ্তাহে মহাসচিবের দৌড়ে নুসায়বেহর যোগ দেওয়ার আগে ছয়টি অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হয়েছে। আরও আগে পদক্ষেপ নেওয়া, মতপার্থক্য সত্ত্বেও মানুষকে এক ছাতার নিচে আনা এবং ফলপ্রসূ ফলাফল না আসা পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.