
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে অনন্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধাম। শিবচতুর্দশীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে এখানে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। তবে অপরিসীম ধর্মীয় ও পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে এই তীর্থকেন্দ্রটির পরিকল্পিত উন্নয়ন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি প্রকট। স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘকাল ধরে চন্দ্রনাথ ধামকে ‘জাতীয় তীর্থক্ষেত্র’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই দাবি উত্থাপন করা হলেও উন্নয়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি বা স্বীকৃতির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো স্পষ্ট হয়নি।
তীর্থযাত্রীদের জন্য এই পাহাড়ি পথে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য এটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। স্থানীয়দের পক্ষ থেকে পাহাড়ি পথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সিঁড়ি সংস্কার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবা জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে। শিবচতুর্দশীর মতো বড় আয়োজনে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাবও তাদের উদ্বেগের কারণ। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রসঙ্গে চলতি বছরের জুন মাসে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সিঁড়ি নির্মাণ, মন্দিরের উন্নয়ন এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে কোন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে কিংবা কোনটি পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পায়নি। উন্নয়নের বর্তমান অবস্থা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে, পাহাড়ি দুর্গমতা কমাতে আধুনিক লিফট স্থাপনের প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সাবেক এমপি অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী লিফট স্থাপন ও সিঁড়ি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন, তবে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিকতা, সম্ভাব্যতা যাচাই কিংবা অর্থায়নের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ রয়েছে।
সাম্প্রতিক শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সীতাকুণ্ডের বড়বাজার সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের এক আলোচনা সভায় এই উন্নয়ন ইস্যুগুলো পুনরায় সামনে আসে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রেমতলা পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনের ওপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর, সদস্যসচিব মো. মোরসালিন, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন এবং উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অমলেন্দু কনক ও সাধারণ সম্পাদক বাবুল বাহাদুর শাস্ত্রীসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন কেবল ধর্মীয় ঐতিহ্যের সংরক্ষণই করবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখবে। তবে উন্নয়নের নামে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তীর্থকেন্দ্রটিকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এখন দীর্ঘদিনের এই প্রত্যাশা পূরণে সরকারের কার্যকর অর্থায়ন, সময়সীমা নির্ধারণ ও জবাবদিহির দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগীরা।





