২১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই বিপ্লবের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও দায়মুক্তিসহ তিন দাবি উত্থাপন

Published: October 6, 2026, 9:06 pm

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং আহত ব্যক্তিরা তিনটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছেন। তারা বিপ্লবটির যথাযথ সাংবিধানিক স্বীকৃতি, আন্দোলনে জড়িত যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি প্রদান এবং বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিচার দ্রুত করার দাবি তুলে ধরেছেন। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির ষষ্ঠ বৈঠকে এই দাবিগুলো উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে শহীদদের অভিভাবক, ভাই-বোন এবং আহত ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংগঠনের ৬৩ জন জুলাইযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বৈঠকে শহীদ পরিবার ও আহতদের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

দাবি বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সুরক্ষার রূপরেখা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, আলোচ্য দাবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শোনা হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যোদ্ধাদের সুরক্ষায় বিদ্যমান অধ্যাদেশটি ইতোমধ্যে আইনি বৈধতা লাভ করেছে। তবে বিষয়টিকে আরও পোক্ত করতে সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এটি সাংবিধানিক মর্যাদা পায়। একইভাবে জুলাই ঘোষণাপত্রটি সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ প্রয়োজনীয় অংশে যুক্ত করার দাবিটি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের চলমান বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল করতে সরকার প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে বদ্ধপরিকর।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের নতুন সমীকরণ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ নিশ্চিত করেছেন যে, সংবিধানে এটি পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার কাজ এগিয়ে চলছে। তবে অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের যে বিতর্কিত বিকল্পটি ছিল, তা এবার বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় গণভোট ব্যবস্থা আবারও বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া চলছে। হাইকোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে ‘ডকট্রিন অব একলিপস’ বা গ্রহণের নীতি অনুসরণ করে পুরনো আইনি কাঠামো পুনরুদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে ‘সাংবিধানিক গণভোট’ প্রবর্তনের কাজ চলছে, যা আগে প্রচলিত আইনি গণভোটের চেয়ে ভিন্ন ও শক্তিশালী হবে। কোনো সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তনের আগে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের মতামতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। আইনের ‘ডকট্রিন অব একলিপস’ নীতি অনুযায়ী, আগের আইনি ব্যবস্থা পুনরায় বহাল হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যে সংশোধনীটা আমরা সামনে গ্রহণ করব- সে জায়গায় এমন কিছু আর্টিকেলের পরিবর্তন, সংশোধন সংযোজন আসবে; যে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল করা হলেও, হাইকোর্ট তা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে। এর বাইরে নতুন কোনো পদ্ধতিতে এটি বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনের রূপকল্প

জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে কমিটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত রেখেই এটি কার্যকর করা হবে। প্রতিবেদন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রস্তাবনাগুলো এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। আগামীতে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সাথে দফায় দফায় মতবিনিময় করা হবে। তাঁদের সবার পরামর্শ ও বিশ্লেষণ পর্যালোচনার পরই জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত বিলটি উত্থাপন করা হবে। এদিনের বৈঠকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানসহ কমিটির সদস্য পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মোঃ নূরুল হক এবং সাকিলা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন। কমিটি প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী বিল জাতিকে উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।