
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারি দলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিএনপি এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। একদিকে সরকার যখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে, অন্যদিকে টেন্ডারবিহীনভাবে সাত থেকে আটশ কোটি টাকার কৃষক কার্ড প্রকল্পটি রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের একজনের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কবজায় চলে যাওয়ার খবর জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি গত পাঁচ মাস ধরে খাল খননের মতো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কাজেও সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। একদিকে সারা দেশে গরিব মানুষ খুঁজে বের করতে সরকার দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ করছে, অন্যদিকে ঠিক সেই সময়ে কোনো ধরনের টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই ৭০০-৮০০ কোটি টাকার কৃষক কার্ড প্রকল্পটি রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের একজনের একজনে। দমন দূরে থাক, নিয়ন্ত্রণেও আনা যাচ্ছে না মতলববাজদের। কারও চাল, ডাল, তেল, সারে কারসাজি, চালবাজি, তেলবাজিতে আখের গোছাতে যারপরনাই ব্যস্ততা। কেউ ব্যস্ত টেন্ডারসহ সরকারি কেনাকাটা, তদবিরবাজিতে শত নয়, হাজার হাজার কোটি টাকা হাতানোতে। সরকারি-বেসরকারি উভয় দিকেই বিনিয়োগ-নিয়োগে বন্ধ্যাত্ব। আগামী কয়েক বছরে নতুন লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকের বেকার হওয়ার শঙ্কা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে এই অনিয়ম কেবল এখানেই থেমে নেই। ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আওতায় ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট বা প্যাড কেনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাতিজার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া গ্যাস সঙ্কটকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে বিএনপির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমপি মুশফিকুর রহমানের নাতির বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের অভিযোগটিও বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রচারিত। প্রধানমন্ত্রীর 'আই হ্যাভ আ প্ল্যান' এবং মিতব্যয়ী সরকার গঠনের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার ঘনিষ্ঠদের এসব কর্মকাণ্ডে তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দলের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাখিল করছে। রাজনৈতিক চাপে কোণঠাসা সরকারের ভেতর থেকে এখন পদত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ১৯ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণার পর এই আলোচনা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর আগে ১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন। এছাড়া ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন পদ ছাড়েন।
জহির উদ্দিন স্বপনের পদত্যাগের পেছনে ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো গুরুতর ঘটনার সম্পৃক্ততা ছিল। গত ২৪ সেপ্টেম্বরের ওই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং ১ অক্টোবর স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন, যার ফলে সংসদ সচিবালয় তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে। শারীরিক অসুস্থতার দোহাই বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের অজুহাত দেওয়া হলেও, মূলত গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতেই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে।
রাজনৈতিক ও আইনি জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্তগুলো সরকারের জন্য সাময়িক রাজনৈতিক চাপ কমানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একের পর এক মন্ত্রী-এমপির বিদায় এবং দুর্নীতির অভিযোগের জের সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অভিযোগ ওঠার পর জনপ্রতিনিধিদের পদত্যাগের এই ধারা সামনের দিনগুলোতে দলের ভেতরে আরও বড় ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামগ্রিক অর্থনীতির চাপ চ্যাপ্টা করে ফেলছে দেশকে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে অর্থনীতির ওপর চাপ।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.