
নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ড এবং নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপিতে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির বিশেষ সভায় বিষয়গুলো নিয়ে কেন্দ্রে লিখিত প্রতিবেদন পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে পাঁচ দিন পার হয়ে গেলেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ায় দলের ভেতর তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাঁর যে বিষয়গুলো আমরা দেখেছি, তা লিখিতভাবে এবং মৌখিকভাবে কেন্দ্রকে অবহিত করব।’।
মঙ্গলবার বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান অভিযোগ করেন, জেলা কমিটির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজসহ শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ এই সংবেদনশীল বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছেন। তাঁদের এই মনোভাব কমিটির অনেককেই হতাশ করেছে। আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজের সভাপতিত্বে ওই সভায় ১৮ জন সদস্য অংশ নেন। দুপুরের খাওয়াদাওয়াসহ আট ঘণ্টা ধরে এই সভা চলে। তাঁদের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি অবশ্যই শাস্তি পাবেন।’। সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান, সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবদুল কাদের মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্যমতে, গত শুক্রবার জেলা পরিষদ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আট ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ সভায় সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, অপরাধী যেই হোক এবং সে প্রভাবশালী কারো আত্মীয় কি না তা বিচার না করে শাকিল হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় এমপি আজিজের ভিডিওর বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আসাদুজ্জামান আরও বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা আহ্বায়ক কমিটি একজন যুগ্ম আহ্বায়ককে বহিষ্কার করতে পারে না, বরং এ বিষয়ে কেন্দ্রকে অবহিত করাই নিয়ম। অথচ আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ গত ১ নভেম্বর সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি এই ইস্যুতে কেন্দ্রে কোনো রিপোর্ট পাঠাবেন না। এর ফলে সাংগঠনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে সদস্যসচিব জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কথা বলে জেনেছেন যে, একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে ইতিমধ্যে ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এর পাঁচ দিন পর আজ মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় শহরের হরিশপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে ১ নভেম্বর আহ্বায়ক (রহিম নেওয়াজ) জানিয়েছেন, তিনি গত সভার।
অন্যদিকে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ এই সংবাদ সম্মেলনকে অগঠনতান্ত্রিক বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, কমিটির ৩৪ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ছয়জনকে নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে এবং বিষয়টি সম্পর্কে তাঁকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তিনি আরও যোগ করেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়া কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক রিপোর্ট দেওয়া নিয়মবহির্ভূত, তাই তিনি কমিটির সদস্যসচিবের ঘোষিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। অথচ কমিটিতে ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ১৪ অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় এলাকায় হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম। গুরুতর আহত অবস্থায় ২৬ অক্টোবর ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকাকালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শাকিলের বাবা রবিউল করিম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে ১৯ অক্টোবর একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে শাকিলের মৃত্যু হলে এটি হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়।
মামলাটিতে এমপি আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে ইতোমধ্যে দুই দফায় রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এছাড়া এই ঘটনায় আল আমিন ও আনিসুর রহমান নামের আরও দুজনকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডে অন্তত ১০ জন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে সাতজনকে চিহ্নিত করে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র আজ মঙ্গলবার জানায়, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শাকিল হত্যায় অন্তত ১০ জন অংশ নিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সাতজনের পাসপোর্ট–সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ডিবি। তাঁরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য দেশের সব স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা আরও জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। এছাড়া মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে গুরুদাসপুরের নয়াবাজার এলাকার একটি বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা পুলিশ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। মোটরসাইকেলটি গুরুদাসপুরের নয়াবাজার এলাকায় সন্দেহভাজন একজনের শ্বশুরবাড়ির আঙিনা থেকে উদ্ধার করা হয়।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.