৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিউইয়র্কে মেধাবী নৃত্যশিল্পী তাসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু: শোকাহত প্রবাসী সমাজ

Published: October 21, 2026, 5:44 pm

আবীর আলমগীর: জীবন যে কতটা অনিশ্চিত এবং নির্মম হতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে রইল তাসিন ফেরদৌসের আকস্মিক অকালমৃত্যু। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়ে স্বামী, শিশুসন্তান, মা-বাবা আর অসংখ্য প্রিয়জনকে রেখে চিরবিদায় নিলেন নিউইয়র্কের মেধাবী নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক তাসিন ফেরদৌস। তাঁর এই আচমকা প্রয়াণে পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নতুন বাড়িতে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে না হতেই চিরদিনের জন্য থেমে গেল তাসিনের জীবন। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই স্বামী এড্রিয়ান ও শিশুপুত্র লুকাসকে নিয়ে কুইন্সে নিজেদের সদ্য কেনা নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তাসিন। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন করে সংসার সাজানোর কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা ছিল তাঁর! কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার আর গুছিয়ে নেওয়া হলো না। যে বয়সে নিজের সন্তানকে বড় করে তোলার স্বপ্ন দেখার কথা, নতুন বাড়িতে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার কথা, নিজের মেধা ও সৃজনশীলতা দিয়ে সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করার কথা, ঠিক সেই বয়সেই পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হলো তাসিনকে। একটি সাজানো সংসারের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোক আর অপূরণীয় শূন্যতায়। তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

সাংস্কৃতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা ও পরিচিতি

তাসিন ছিলেন নিউইয়র্কের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস এবং বিশিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জাফর ফেরদৌসের একমাত্র কন্যা। পারিবারিকভাবেই তিনি ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতির আবহে বেড়ে উঠেছিলেন। নৃত্যকলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অনন্য মেধা ও নিষ্ঠা নিউইয়র্কের সাহিত্য-সংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে এক বিশেষ স্থান করে দিয়েছিল। বিপা-এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনা ও নতুন প্রজন্মকে নাচ শেখানোর পেছনে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম।

সামান্য হাতব্যথা থেকে মৃত্যু: কী ঘটেছিল সেই কয়েক দিনে?

তাসিনের মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জেগেছে, কীভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি আপাতসাধারণ শারীরিক সমস্যা এত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনল? গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার হাতে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করলে তাসিন তাঁর মা এ্যানি ফেরদৌসকে ফোন করেন। শারীরিক পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পরিবারের পরিচিত একজন চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো হলে তিনি আর দেরি না করে জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তী সময়ে একই সমস্যা নিয়ে তিনি নিউইয়র্ক প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালেও যান। পাশাপাশি হাতে ছোট ছোট ক্ষতও দেখা যাচ্ছিল।

পরামর্শ অনুযায়ী স্বজনেরা দ্রুত তাঁকে কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রাথমিকভাবে তাঁর শারীরিক সমস্যাকে ততটা গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। সেখানে যথাযথ চিকিৎসা পেতে কিছুটা বিলম্ব হয় বলে স্বজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। অবশেষে গত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তাসিন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা শুনে উদ্বিগ্ন মা ছুটে যান তাঁর বাসায়। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসিন দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন।

চিকিৎসকদের বক্তব্য ও পরিবার-কমিউনিটির শোক

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা পরবর্তীতে জানিয়েছেন যে তাসিনের শরীরে অত্যন্ত মারাত্মক ও দ্রুত বিস্তারকারী সংক্রমণ (ইনফেকশন) ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অনাকাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাগত পরিণতি ও অবহেলার অভিযোগে স্বজনদের মাঝে ক্ষোভ ও বিষাদ তৈরি হয়েছে। একজন সুস্থ, প্রাণবন্ত তরুণীর এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, পেশিতে টান বা মাসল পুলের কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। শুক্রবার রাত থেকে রোববার ভোর, এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত তরুণীর এমন করুণ পরিণতি পরিবার, স্বজন এবং পরিচিতজনদের কাছে এখনো অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কা করা হলেও কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটল কেন, এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত বা অটোপসির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে পরিবার আশা করছে।

তাসিনের এই অকালপ্রয়াণে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। বিপা-এর সদস্যসহ তাঁর অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ও গুণগ্রাহী এই শোকে স্তব্ধ। সকলেই তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।