
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আর ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটিতে অনেক ভোটারের কাছে তাঁকে ভোট দিতে হয়তো শুধু এই একটি কারণই যথেষ্ট। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব অঞ্চল ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন বিরোধী জোটের নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। এবার বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইয়াশার পার্টি। চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল–জাজিরা এ খবর দিয়েছে। আইজেনকট নিজের জাতিগত পরিচয়ের কথা খুব কমই বলেন। আইজেনকট হতে পারলে তিনিই হবেন প্রথম।
সর্বশেষ বুথফেরত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি এবং আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টি আসনে জয়লাভের পথে রয়েছে। বুথফেরত জরিপ (এক্সিট পোল) অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২ আসনে জিততে চলেছে। আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ৪৯ আসনে জিততে পারে। সামান্য এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কেউই। আইজেনকটের বেড়ে ওঠার গল্প নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠার গল্পের একেবারেই বিপরীত। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে এই পরিচয়েরও ভূমিকা রয়েছে।
এছাড়া ইসরায়েলি আরব দলগুলোর জোট 'আরব লিস্ট' ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি আরব দলগুলোর জোট আরব লিস্ট জিততে পারে ১৯ আসনে।
তবে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
মরক্কো থেকে অভিবাসী হিসেবে আসা পরিবারের সন্তান ৬৬ বছর বয়সী গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছেন। ৯ ভাই-বোনের পরিবারে বেড়ে ওঠা আইজেনকট ১৯৭৮ সালে গোলানি ব্রিগেডে যোগদানের মাধ্যমে সামরিক জীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ৪০ বছর বাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। তার সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও শৃঙ্খলার কারণে তিনি একজন বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাতে অঞ্চলে। এক বছর আগেও জনমত জরিপে তাঁর সমর্থন ছিল এক অঙ্কের ঘরে। ২০২২ সালে আরেক সাবেক চিফ অব স্টাফ বেনি গ্যান্টজের সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আইজেনকট।
আইজেনকটের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি আসে ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধের সময়। যুদ্ধের দুই মাস পর ডিসেম্বর মাসে তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল আইজেনকট গাজায় নিহত হন। ছেলের মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও তা তাকে সক্রিয় রাজনীতিতে আরও দৃঢ় করেছে। ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ছেলের রক্তদান বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ইসরায়েল গড়ার লড়াই চালিয়ে যাবেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় আইজেনকট বারবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছেন, যা জিম্মিদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই মতবিরোধই শেষ পর্যন্ত তাকে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসন অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন। এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে আইজেনকটের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি খুবই সাধারণ ও অনস্বীকার্য বিষয়—তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নন। নেতানিয়াহুর কপালে কী আছে—ক্ষমতা, নাকি কারাগার। নেতানিয়াহু জেরুজালেমের অভিজাত পরিবেশ ও ক্ষমতাবানদের বৃত্তের ভেতর বেড়ে উঠেছেন। সেখান থেকে উঠে এসে ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লড়াইয়ে বিরোধীদের প্রধান প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন এবং সে সময় নেতানিয়াহুর অধীনেই দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর দুজনই নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তবে যুদ্ধ–পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট কোনো কৌশল না থাকার কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের জুনে তাঁরা মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে যান।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই।
ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জটিল রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন হবে।
তবে ইসরায়েলের মানুষ এখন এমন এক নেতাকে খুঁজছে যিনি নেতানিয়াহুর এককেন্দ্রিক শাসনের পরিবর্তে জবাবদিহি ও জাতীয় সংহতিকে প্রাধান্য দেবেন।
আইজেনকটের 'ইয়াশার' দল জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও আইজেনকটের উত্থান ইসরায়েলি রাজনীতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.