
বিসমিল্লাহ টি-স্টলের বেঞ্চিতে বসে মোতালেব সাহেবের মেজাজ আজ ৪৪০ ভোল্ট। বাজারে গিয়ে ব্রয়লার মুরগি আর কাঁচামরিচের আকাশচুম্বী দাম দেখে তিনি রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তার মনে হচ্ছে, দেশের মুরগিগুলো যেন সোনার ডিম পাড়ছে আর কৃষকরা মরিচের খেতে ইউরিয়ার বদলে সোনা ছিটানো শুরু করেছেন। দোকানে বসেই তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বললেন, প্রত্যাশা ছিল দেশটা দ্রুত পাল্টে যাবে, কিন্তু সাত-আট মাসে শুধু পকেটই খালি হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কিন্তু এই সাত-আট মাসেই তো পকেট গড়ের মাঠ।
পাশের বেঞ্চিতে বসে আয়েশি ভঙ্গিতে চা-টোস্ট খাচ্ছিলেন এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ও সমাজ বিশ্লেষক কুদ্দুস ভাই। মোতালেব সাহেবের অভিযোগের জবাবে তিনি শান্ত গলায় বোঝাতে চাইলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ধৈর্য প্রয়োজন। তার মতে, নতুন সংসার সাজাতে যেমন সময় লাগে, একটি জরাজীর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা ঠিক করতেও সাত-আট মাস সময় খুব সামান্য। কুদ্দুস ভাইয়ের ভাষায়, আগের জঞ্জাল পরিষ্কার করতেই এখন ব্লিচিং পাউডার ছড়াতে হচ্ছে, তাই অস্থিরতা সাময়িক। বিস্কুটটা অর্ধেক গলে চায়ের কাপে খসে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি সেটা মুখে পুরে দিলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে বললেন, ‘মোতালেব মিয়া, তোমার সমস্যা হলো তুমি রকেট গতিতে রেজাল্ট চাও। আরে ভাই, একটা নতুন বউ ঘরে আনলেও তো তার হাতের রান্না মুখে রুচতে আর সংসারের নিয়ম বুঝতে অন্তত ছয়-সাত মাস লাগে। এখনই তুমি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলে?’। এত দিনে তো একটা বিল্ডিংয়ের তিন তলার ছাদ ঢালাই হয়ে যায়। কুদ্দুস ভাই হাসলেন। ‘নতুন বিল্ডিং তুললে তো তা-ই হয়।
তরুণ শ্রোতা রফিকও কুদ্দুস ভাইয়ের সাথে একমত পোষণ করল। সে বলল, আমরা সাধারণত রাতারাতি পরিবর্তনের আশা করি, যা বাস্তবসম্মত নয়। আগের আমলের ভুল সংশোধন করে নতুন পথে হাঁটতে কিছুটা সময় লাগাই স্বাভাবিক। বর্তমান সরকারকে সে পরীক্ষার হলে আগের ছাত্রের ভুল খাতা মুছতে থাকা শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা করল। মোতালেব সাহেবের প্রশ্নের জবাবে কুদ্দুস ভাই যোগ করলেন, সরকার যে একদম কিছু করছে না তা নয়, বরং ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও চুরি বন্ধে ভয়ের সংস্কৃতি কিছুটা হলেও ফিরে আসছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
তবে আলোচনার মূল চমক ছিল কুদ্দুস ভাইয়ের 'গোল্ডেন রুল' বা রাজনীতির অমোঘ সত্য নিয়ে। তিনি স্পষ্ট করলেন, দেশে ম্যান্ডেট পাওয়ার পর সরকার ভালো করুক বা খারাপ, পাঁচ বছর ক্ষমতার মেয়াদ নিশ্চিত। অর্থাৎ, ভালো কাজের প্রশংসা বা ব্যর্থতার সমালোচনা যাই হোক না কেন, পাঁচ বছরের আগে সরকার পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। এটি একটি 'নন-রিফান্ডেবল' পলিসির মতো, যেখানে দর্শক হিসেবে ধৈর্য ধারণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা থাকে না।
কুদ্দুস ভাইয়ের এমন বাস্তবমুখী যুক্তিতে মোতালেব সাহেব কিছুটা নমনীয় হলেন। তিনি স্বীকার করলেন, পাঁচ বছরের চুক্তি যেহেতু ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে গেছে, তাই অহেতুক চিৎকার না করে দেখার প্রয়োজন সরকারের কাজের প্রক্রিয়াটি কী। রফিকও পরামর্শ দিল, সরকার এখন ট্রেইলার রিলিজ করেছে মাত্র, সিনেমা এখনো অনেক বাকি। শেষে ভালো করলে হাততালি আর ব্যর্থতায় সমালোচনা করার সময় তো পাঁচ বছর পরেই আসবে।
সবশেষে মোতালেব সাহেবের প্রেশার কিছুটা কমল। তিনি মুচকি হেসে দোকানিকে আরেকটি লাল চা দিতে বললেন। মোতালেব সাহেব উপলব্ধি করলেন, বাকি চার বছর এই ধৈর্য ও চায়ের কাপের আড্ডাতেই পার করতে হবে। কারণ, পাঁচ বছরের সিনেমাটি শেষ হওয়ার আগে দর্শক হিসেবে তাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর করার কিছু নেই।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.