
রাজধানীর আব্দুল গনি রোডের বর্তমান সচিবালয়ে আর নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করা হবে না। সরকার সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সচিবালয়কে সরানো নিয়ে আলোচনা হয়নি। সচিবালয়কে কোথায় স্থানান্তর করা যায়, তা নিয়ে গত পাঁচ মাসে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পাঁচ মাস ধরে পর্যালোচনা করে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগটি বাস্তবায়নে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে চিঠি দিয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে এবং আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার চাচ্ছে দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে যাতে বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়। বলা হয়, ২০১৮ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সচিবালয় স্থানান্তরের জন্য তিনটি আলাদা নকশা উপস্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্য থেকে একটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য এই নকশাটি তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্তে সবাই একমত হন।
নতুন সচিবালয়ের প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, ভবনগুলো হবে ১২ তলার এবং জাতীয় সংসদ ভবনের আদলে তৈরি করা হবে। বর্তমান সচিবালয়ে ১৭ লাখ বর্গফুটের জায়গা রয়েছে, যা দাপ্তরিক কাজের জন্য অপ্রতুল। নতুন জায়গায় ৩১ লাখ বর্গফুট এলাকা পাওয়া যাবে। এছাড়া সচিবালয়ের চারপাশে একটি চক্রাকার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে যা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কে যুক্ত হবে। যানজট নিরসনে বিজয় সরণি থেকে মিরপুর ১০ নম্বরগামী সড়কের নিচ দিয়ে পাতাল পথ নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মেলার পুরনো মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় সরকারি জমি দখলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয় মনে করছে, সেখানে সচিবালয় তৈরি হলে জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। চার বছর আগে এখানে পার্ক নির্মাণের ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে আবদুল গনি রোডের সচিবালয় স্থানান্তরিত হলে সেখানকার অবকাঠামো ঢাকা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে। জিয়া উদ্যানের উত্তর ও বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম দিকে, যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা হয়, সেখানেই ৩২ একর জমির ওপর সচিবালয় তৈরি করার কথা তখন বলা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারও বিভিন্ন সময়ে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১৫ সালে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আলোর মুখ দেখেনি। চলতি বছরের এপ্রিলে একনেক সভায় সচিবালয়ের ভেতর ২১ তলা ভবন নির্মাণের সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প উত্থাপন করা হলেও তা প্রধানমন্ত্রী ফেরত পাঠান এবং স্থানান্তরের সম্ভাবনা পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় এ প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে তা অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
তবে এই প্রকল্প নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। স্থপতি ইকবাল হাবিব মনে করেন, ১৯৬৯ সালে লুই কানের করা নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তর বর্তমান সময়ের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নয়। তিনি জানান, এলাকাটিতে এরই মধ্যে অনেক সরকারি স্থাপনা তৈরি হওয়ায় যানজট বেড়েছে। সচিবালয় সেখানে হলে যান চলাচল পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো বাংলাদেশের সচিবালয়কে বিকল্প কোনো স্থানে সরিয়ে নেওয়া বেশি যৌক্তিক হতো। নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে ১৪ তলা ভিতের ওপর ৯ তলাবিশিষ্ট ৪টি মূল ভবন করার কথা ছিল।





