
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১ কোটি মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল। ১৯৬৮ সালে মাত্র ২৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ১ হাজার শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হলেও সেবার মান ও জনবল কাঠামো সেই অনুপাতে বাড়েনি। বর্তমানের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানো হচ্ছে ৫০০ শয্যার পুরোনো জনবলকাঠামো দিয়ে। ফলে শয্যাসংখ্যার তুলনায় আড়াই গুণ বেশি রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ৪ হাজার রোগী সেবা নিতে আসেন এবং সব মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকেন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে কথা হয় আবদুস সালামের সঙ্গে। অবশ্য শয্যা না পাওয়া নিয়ে তাঁর আক্ষেপ নেই।
হাসপাতালের নতুন ভবনে চিকিৎসাধীন বরগুনা থেকে আসা আবদুস সালাম ও বেলাল হোসেনের মতো অনেক রোগীই শয্যা না পেয়ে মেঝে বা বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন। দীর্ঘ সাত দিন জ্বরে ভুগে আসা আবদুস সালাম জানান, শয্যা না পাওয়ার পাশাপাশি এই পরিবেশে সুস্থ হওয়া কঠিন। অন্যদিকে বেলাল হোসেন অভিযোগ করেন, হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে দুর্গন্ধ ও নোংরার কারণে সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রোগীদের অভিযোগ, শয্যা সংকটের কারণে হাসপাতালের ওয়ার্ড, বারান্দা এমনকি হাঁটাচলার পথেও রোগীদের বিছানা পাততে হচ্ছে। জ্বর নিয়ন্ত্রণে না আসায় ৭০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গত রোববার বিকেলে বরগুনা থেকে বরিশালে আসেন। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই জ্বরে কাহিল। তিনিও শয্যা না পেয়ে একই ভবনের বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতেছেন। তবে বেলাল হোসেন বলেন, হাসপাতালের শৌচাগারগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।
চিকিৎসক ও জনবল সংকটের চিত্র আরও প্রকট। বর্তমানে অনুমোদিত ৩২৩টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ২২৯ জন, অর্থাৎ ৯৪টি পদই শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৯৭টি পদের মধ্যে ২৮২টি খালি। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ১৮৩টির মধ্যে ৬৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ৪১৪টি পদের মধ্যে ২১৬টি পদ শূন্য রয়েছে। বহির্বিভাগে ৪ হাজার রোগীর বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৫৩ জন, যার অর্থ একজন চিকিৎসককে গড়ে ৭৫ জন রোগী দেখতে হয়। এর ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, বিশেষ করে বিকেল তিনটা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত।
হাসপাতালের লজিস্টিক সাপোর্টেও রয়েছে বড় ঘাটতি। জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডগুলোতে রোগী পরিবহনের জন্য ট্রলির চরম অভাব রয়েছে। ২১টি ট্রলিম্যান পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯ জন। ট্রলি আছে মাত্র ১৩টি, যার মধ্যে সচল থাকে ৯-১০টি। অথচ এই চাপে অন্তত ৫০টি ট্রলি প্রয়োজন। নাতি রামিন হোসেনের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে বহন করার মতো ট্রলি না পেয়ে স্বজনদেরই সিএনজিচালকের সহায়তায় তিনতলায় রোগী নিয়ে উঠতে হয়েছে।
চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালটিতে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বা সিসিএম ইউনিট নেই। হৃদরোগীদের জন্য ক্যাথল্যাবের অভাব থাকায় এনজিওগ্রামসহ বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকা অভিমুখে ছুটতে হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ সংকট নতুন ভবনের কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। দিনে-রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় লিফট, ফ্যান ও লাইট বন্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা ২০-২৫টি থেকে কমে ১০-১২টিতে নেমে এসেছে। জেনারেটর থাকলেও তা চালাতে প্রতি ঘণ্টায় ১১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, যা নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর জানান, পুরোনো অবকাঠামো ও জনবল সংকটের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জনবল ও জ্বালানিসহ অন্যান্য সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোনো ভবনে দুটি বিদ্যুৎ লাইন থাকলেও নতুন ভবনের জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জেনারেটরের জ্বালানি বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.