
ব্যস্ত শহরের আটপৌরে জীবনে নিয়মিত হাঁটাচলা ও নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে ফিরে আসার পর গত সপ্তাহে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর সেখানে গিয়ে নজরে এল পার্কের প্রবেশপথে নামফলক বদলে রাখা হয়েছে ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্স’। ক্লাব ভবনে নতুন স্থাপিত ‘কবি আল মাহমুদ পাঠাগার’ দেখে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। অথচ একসময় কবি আল মাহমুদকে ঢাকাতে কবর দিতে পর্যন্ত বাধা দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাস যে শেষ পর্যন্ত আল মাহমুদকে যোগ্য সম্মান দিয়েছে, তা আজকের প্রজন্ম আইকন নির্বাচনে ভুল না করার মাধ্যমেই প্রমাণ করে। এখন শেখ মুজিবের বিভিন্ন দিবসেও তাঁর অনুসারীরা আল মাহমুদের ‘নিশিডাক’ কবিতাটি উদ্ধৃত করেন।
জুলাই মাসের পরবর্তী সময়েও সব অনিয়ম যে বন্ধ হয়েছে তা নয়। এখনো গুলশানের সাহাবুদ্দীন পার্কের ভেতরে ‘নর্থ এন্ড কফিশপ ও রোস্টার’-এর মতো বাণিজ্যিক স্থাপনার অবাঞ্ছিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ উপস্থিতি জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। তবে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। গুলশান অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন অংশটি এখনো সেই নামেই পরিচিত। এর পূর্ব দিকের অংশটি আগে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে তা গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত।
পার্কটির অতীতের ইতিহাস বেশ অস্থির। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গুলশান ইয়ুথ ক্লাব একসময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদের নজরে পড়েছিল। সেই সময়ে এই পার্কের অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন অংশটি ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’ হিসেবে যমুনা গ্রুপকে এবং পূর্ব অংশটি ‘বন কিডস’ নামে র্যাংগস গ্রুপকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তরুণদের প্রতিবাদের মুখে মধ্যবর্তী অংশটি গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালে ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যামিউজমেন্ট পার্ক উচ্ছেদ করা হয়। সেখানে পুনরায় গাছপালা রোপণ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং এর নাম রাখা হয় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক। পরবর্তী সময়ে দুই অংশ মিলিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় গুলশান ইয়ুথ ক্লাব। তবে দুই মন্ত্রণালয়—পূর্ত ও স্থানীয় সরকার—এবং দুই সংস্থা রাজউক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে শেষ পর্যন্ত রাজউককেই পার্কের মালিক হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাজউকের সাথে সমঝোতা স্মারকের আওতায় এখন ক্লাবটি পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ করছে।
বর্তমান গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সে হাঁটাচলার জায়গার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার সরঞ্জাম, ক্রিকেট মাঠ, নেট প্র্যাকটিস, বাস্কেটবল কোর্ট, ইনডোর ব্যাডমিন্টন, জিম, সুইমিংপুল এবং স্কেটিংয়ের মতো আধুনিক সুবিধা রয়েছে। সম্প্রতি সেখানে ফুটবল খেলার টার্ফও যুক্ত করা হয়েছে। এই পার্কের মাধ্যমে জাকাত তহবিল থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নাশতাসহ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়। এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বর্তমানে এখানে ২৫ জন কোচ ও প্রশিক্ষক, ৮ জন অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েক ডজন প্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োজিত আছেন।
মূলত পার্ক পরিচালনার বিশাল ব্যয়ের অজুহাত দিয়েই অতীতে ভূমিদস্যুরা এখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ার সুযোগ পেয়েছে। অর্থনীতিবিদ বুকানন ১৯৬৫ সালে তাঁর তত্ত্বে ক্লাব গুডসের কথা বলেছিলেন, যার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং যা ভিড় এড়াতে সহায়ক। বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের সেবার ব্যয় নির্বাহ করতে সদস্য ফি ও ব্যবহার ফি কার্যকর ভূমিকা রাখে। গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সও এই মডেল অনুসরণ করছে। তবুও কারো কারো অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওয়ান্ডারল্যান্ড কিংবা কফিশপ স্থাপনের চেয়ে বর্তমান এই ব্যবস্থা অনেক বেশি জনবান্ধব।
এখানেই শেষ নয়, সরকারি জমি বিনা মূল্যে ব্যবহার করে সদস্য ও ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করায় গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমি সংস্থাটির ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট দেখেছি, যেখানে চলতি বছরের নিরীক্ষিত হিসাব অনুমোদনের কথা বলা হলেও বিস্তারিত আয়-ব্যয়ের হিসাব সেখানে অনুপস্থিত। তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পার্কমুখী করা অপরিহার্য। তাই ভূমিদস্যুদের হাত থেকে পার্ক রক্ষা করতে সামাজিক অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি সব আর্থিক হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানাই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বেশ কিছুদিন হলো, আবার অভ্যস্ত, গৎবাঁধা ও আটপৌরে জীবনে ফিরে এসেছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দিনের শুরুতে সকালে পার্কে হাঁটতে যাওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা–সম্পর্কিত বিবিধ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, বই পড়া, লেখালেখি, ছুটির দিনে বাজারঘাট করা ইত্যাদি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক নামটি পাল্টে ফেলা হয়েছে জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৯৭৮ সালে স্থাপিত গুলশান ইয়ুথ ক্লাব, একসময় আমাদের দেশের প্রথম ব্যবসায়ী রাষ্ট্রপতি এরশাদের শ্যেন দৃষ্টিতে পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে করে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়, তাহলে পার্কের মালিক কে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এই পার্কটিতে হাঁটাহাঁটির, বাচ্চাদের দোলনা ও অন্যান্য খেলার সামগ্রীর ব্যবস্থা ছাড়াও আগে থেকেই এখানে আছে ক্রিকেট খেলার মাঠ ও নেট প্র্যাকটিসের সুবিধা, বাস্কেটবল কোর্ট, ইনডোর ব্যাডমিন্টন, সুইমিংপুল, ফিটনেস সেন্টার ও জিম, রোলার স্কেটিং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জমজমাট এই পার্কটিতে শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে বয়স্করা সবাই আসে নিজ নিজ আগ্রহের খেলা খেলতে ও কাজটি করতে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.