২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না: ভারতের প্রধান বিচারপতি

Published: October 9, 2026, 7:38 pm

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচি রুখতে সরকার যে কার্যত দিল্লি বনধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তাতে বাদ সাধল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেন, মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আন্দোলন মোকাবিলার নামে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা কিংবা টানা ১০ ঘণ্টা রেল চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আগামীকাল শনিবার ১০ অক্টোবর ‘যন্তর মন্তর ২.০’–এর ডাক তাদেরই দেওয়া। আপনারা সবকিছু এভাবে বন্ধ করে দিতে পারেন না।

আদালতের কঠোর নির্দেশ

কপিল সিব্বাল, গোপাল শংকরানারায়ণ, অভিষেক মনু সিংভি, বৃন্দা গ্রোভার, এন হরিহরণ ও প্রশান্ত ভূষণের মতো বিশিষ্ট আইনজীবীদের সওয়াল শোনার পর প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ আজ শুক্রবার দিল্লির জনজীবন সচল রাখার এই নির্দেশ দেন। বিচারপতিরা বলেন, ট্রেন চলাচল কিংবা শহরের অভ্যন্তরে যান চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে চূড়ান্ত অসুবিধায় পড়তে না হয়। বিধিনিষেধ কোথায় কতটা, তা জনসাধারণকে আগেভাগে জানিয়ে দিতে হবে। প্রধান বিচারপতি আরও নির্দেশ দেন, যন্তর মন্তর যদি বিক্ষোভ দেখানোর উপযুক্ত স্থান না হয়, তবে সরকারকে অবিলম্বে অন্য কোনো এলাকা নির্ধারণ করতে হবে যেখানে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থাকবে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে আশ্বস্ত করেন যে, সাধারণ মানুষের যেন অসুবিধা না হয় তা নিশ্চিত করা হবে। এই পরিস্থিতিতে বিশিষ্ট আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির এজলাসে উপস্থিত হয়ে দ্রুত এর বিহিত করার অনুরোধ জানান।

সরকারের কড়াকড়ি ও প্রতিবাদ

  • দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ও রেলস্টেশনে ১০ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বাতিলের পরিকল্পনা নিয়ে আদালতের তীব্র ভর্ৎসনা।
  • দিল্লির বিভিন্ন সীমান্তে কড়া নজরদারি ও বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ধরপাকড়ের মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণকে আটক করার অভিযোগ।
  • দিল্লির হোটেলগুলোকে দুই দিন অতিথি ভাড়া না দেওয়ার নির্দেশ এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার সরকারি পরিকল্পনা।
  • অ্যাপ ক্যাব নিয়ন্ত্রণ এবং আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার জওয়ান মোতায়েনের মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপের সমালোচনা।
  • সিজেপি নেতাদের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিকে ‘জরুরি অবস্থার’ সাথে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে কটাক্ষ।

এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’-এর নেত্রী নেহা বোরা এক ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত ছাড়ো আন্দোলন রুখতে যেভাবে প্রশাসন কোমর বেঁধেছিল, সরকার এখন ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বার্তা দেন, পুলিশ যেখানেই আটকাবে, সেখানেই বসে পড়তে হবে এবং জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে অনড় থাকতে হবে। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের লড়াই নয়, বরং জনগণের লড়াই বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক তৎপরতা ও রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎ

এদিকে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত আটটার সময় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ১০ জন প্রতিনিধিকে দেখা করার অনুমতি দিয়েছেন। বিরোধী জোটের পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও নাগরিক সমাজের বহু মানুষ, বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এবং একাধিক বেসরকারি সংগঠন এই আন্দোলনের শরিক হয়েছে। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও ইতিমধ্যে এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে বেঙ্গালুরুর সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। আদালতের হস্তক্ষেপে আগামীকালের কর্মসূচিতে জনজীবন সচল থাকবে কি না, তা নিয়ে এখন নজর সবার। সিজেপির ওই আন্দোলনে শরিক হতে জার্মানি থেকে ভারতে এসেছেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। ছাত্রছাত্রীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁরা যেন আন্দোলনের শরিক না হন।