
মা গৃহিণী কোহিনুর পারভীন। ছোটবেলা থেকে সন্তানের পড়াশোনার পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তিনি, রাতের পর রাত জেগে লিখে দিয়েছেন নোট। সেই পরিশ্রমের ফসল হিসেবে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে মেয়ে তাসমিয়া ইসলাম। নিজের সাফল্যের আনন্দ ভাগ করে নিতে মা ও বাবা আতিকুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল সে। বর্তমানে তাসমিয়া শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে। কোহিনুর পারভীন জানান, বড় মেয়ে তাসনিম মালিহা ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ পেলেও তখন কোনো সংবর্ধনা পায়নি, তাই ছোট মেয়ের এই প্রাপ্তিটা তাঁদের কাছে বিশেষ আনন্দের। শিখো– জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনায় তাই মা কোহিনুর পারভীনকে নিয়ে এসেছে সে। ভোরে নিজের জমিতে একবার ঢুঁ মেরে বাড়ি ফিরে আসেন। তাসমিয়া ও সুমাইয়াদের মতো কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণে মূল অনুষ্ঠান শুরুর এক ঘণ্টা আগেই মিলনায়তন মুখর হয়ে ওঠে।
আয়োজনে ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় ২০২৬ সালে সারা দেশে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে আজ শনিবার পাবনার বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন। অনুষ্ঠানটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় ছিল কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও বন্ধুসভা।
অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ মোটরসাইকেলে পাড়ি দিয়ে এসেছেন পাবনার ঈশ্বরদীর সলিমপুর ইউনিয়নের বড়ইচারা গ্রামের কৃষক সেলিম রেজা। তাঁর মেয়ে সুমাইয়া তাবাচ্ছুম এবার মানিকনগর গার্লস হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন সে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে পড়ছে এবং ভবিষ্যতে আইনজীবী হতে চায়। বাবার চোখে মেয়ের এই অর্জনের আনন্দ স্পষ্ট ছিল, যা তিনি ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করে রাখেন মা নুসরাত জাহানকে দেখানোর জন্য। মিলনায়তন প্রাঙ্গণে দেখা যায়, বাবা সেলিম রেজা মুঠোফোনে যত্নে মেয়ের ছবি তুলে দিচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করতেই সুমাইয়া জানায়, ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মূল পর্বের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন আলোকচিত্রী হাসান মাহমুদ এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাবনা প্রতিনিধি সরোয়ার মোর্শেদ। মূল মিলনায়তনে ৮০০ আসন থাকলেও প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। ফলে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী বাইরে বারান্দায় বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। বাকি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা মিলনায়তনের বাইরে বারান্দায় প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেন।
শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন পাবনা শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ আখতার জামান। তিনি বলেন, পিছিয়ে পড়া বন্ধুদের নিয়ে এগিয়ে চলতে এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুল্লাহ্ শিক্ষার্থীদের ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ অভিহিত করে ভালো মানুষ হওয়ার ওপর জোর দেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান মীর হুমায়ুন কবীর শিক্ষার্থীদের স্মার্ট হওয়ার পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিকেও জিপিএ-৫ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে বলেন। পিছিয়ে পড়া বন্ধুকে সঙ্গে নেবে, ভালো কিছু করবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তা ম্যাগাজিন পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়। সুজানগর থেকে আসা শিক্ষার্থী উম্মে আফরিনের বক্তৃতার পর সাংস্কৃতিক পর্বে বন্ধুসভার মাইশা আলমের নাচ এবং অরফিউজিক ব্যান্ডের শাহরিয়ার রাতিনের গান উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মাঝে দারুণ উদ্দীপনা ছড়ায়।





