
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সংঘটিত নজিরবিহীন ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার বেলা ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ক্ষমতার গরমের আঁচ এবার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর পড়েছে।’ তিনি অবিলম্বে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। তারা শুরুতে দায়িত্বরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে এবং এরপর ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। সবশেষে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনাটির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াত আমির। তিনি অভিযোগ করেন, রাতের আঁধারে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে সেখানে একটি রহস্যজনক সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, একদিকে সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তারাই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এই সুযোগটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিল।’। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে, আর মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তে স্পষ্ট করতে হবে।
একই ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিম। এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা জানান, স্থানীয় কিছু ব্যক্তির ভাষ্য ও গণমাধ্যমে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এক সংসদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির এক নেতার পরিকল্পনা ও ইন্ধনে এ হামলা চালানো হয়েছে। তাঁরা বলেন, জমি নিয়ে মালিকানা সংক্রান্ত কোনো বিরোধ থাকলে তা আইন বা আদালতের মাধ্যমে সুরাহা করার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁরা বিষয়টির দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন। এর পেছনে কারা রয়েছে, তা আর মোটেই অস্পষ্ট নয়। তাদের পেটের ক্ষুধা কোনোভাবেই নিবারণ হচ্ছে না। জামায়াতের মহানগর আমির-সেক্রেটারির বিবৃতি। তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী পরিচয় যেন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে। বিবৃতিতে বলা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘মব কালচার শেষ’ এবং দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না।
আমার বাংলাদেশ পার্টিও (এবি পার্টি) এই হামলার প্রতিবাদে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওহাব মিনার ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে কেবল একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও জনগণের নিরাপত্তার ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, এই হামলায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সরঞ্জাম, ওষুধ, রেজিস্টার ও মূল্যবান নথি রয়েছে।
এবি পার্টির নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া ‘মব কালচার’ বিরোধী বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন, সরকার যদি সত্যিই এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে থাকে, তবে মিরপুরের ঘটনায় তার প্রতিফলন দেখাতে হবে। তারা ছয়টি দাবি উত্থাপন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে: ১. হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে দ্রুত গ্রেপ্তার করা, ২. পরিকল্পনাকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা, ৩. লুট হওয়া সরকারি টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রী উদ্ধার, ৪. পুলিশের ভূমিকা ও গাফিলতি তদন্ত করা, ৫. জমি বা লিজ সংক্রান্ত বিরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা এবং ৬. ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দ্রুত পুনর্বহাল করা। মবের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান শুধু বক্তব্যে নয়, মাঠেও প্রমাণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মূল কেন্দ্র হিসেবে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। এই হামলার ফলে স্থানীয় শিশু ও মায়েরা চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছেন এবং টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সেবার আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.