
পিরোজপুরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার দিবাগত রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফন নিয়ে দিনভর চলা অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর গভীর রাতে এই প্রক্রিয়া শেষ হয়। এরপর মরদেহ কোথায় এবং কীভাবে দাফন করা হবে, তা নিয়ে পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তার কারণে মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়। রাষ্ট্রীয় সম্মানে গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতির সময়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। নিরাপত্তার খাতিরে মরদেহ পুলিশ লাইনে সরিয়ে নেওয়া হয়। আজ রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। সেখানে অবস্থানকালে গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানিক পশারীর মেয়ের জামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফতেখারুল ইসলাম শামীমের কাছে গেলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা নিশ্চিত করা হলেও শুরুতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ লাইন থেকে শংকরপাশা ইউনিয়নে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে লোকজনের জড়ো হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। দিনের বেশির ভাগ সময় মরদেহ নিয়ে অপেক্ষা করার পর রাতের দিকে দাফনের প্রস্তুতি শুরু হয়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। তিনি বলেন, “আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। পরিবারের এ বক্তব্যে দাফন নিয়ে তাঁদের ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতির কারণে দাফন কাজে বাধা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই কবর খোঁড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এদিকে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, জামায়াত নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে দাফন কাজে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হয়নি। পিরোজপুর সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে যাবতীয় প্রতিকূলতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দাবি, জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাফনে কোনো বাধা দেননি। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। একবার কবর খোঁড়ার পর সেটি আবার ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। জামায়াত নেতার দাবি, তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও আপত্তি তুলেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক। তবে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে জামায়াত নেতার এ দাবির সমর্থনে কোনো যাচাইকৃত নথি বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ওই অপরাধের মামলাটি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে থাকা মূল মামলার সঙ্গে একীভূত করা হয়। মামলার বাদী এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে দীর্ঘ সময় আলোচনায় ছিলেন মানিক পশারী। মূলত সাঈদীর বিরুদ্ধে এই মামলাটি কেন্দ্র করেই তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহের শেষ বিদায় নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েন সামাজিক অঙ্গনে বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরদেহের শেষকৃত্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা পরিবারের জন্য যেমন চরম কষ্টের, তেমনি এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও আইনের শাসনের প্রতিও এক বড় চ্যালেঞ্জ। সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ছিলেন মানিক পশারী মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.