১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজধানীতে বেপরোয়া চাঁদাবাজ: অস্ত্রধারী ১৪৮ জনের তালিকা পুলিশের হাতে

Published: September 29, 2026, 12:57 am

রাজধানী ঢাকায় চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এমনকি বাড়ির মালিকদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে অপরাধীরা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নগরীর ৫০টি থানার মধ্যে ৪৯টিতেই চাঁদাবাজির প্রকোপ রয়েছে। এসব থানায় দায়ের করা মামলার ৮৫ শতাংশ অভিযোগই পুলিশের তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বিচারকাজ শুরু না হওয়ার কারণে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা ও শঙ্কা বিরাজ করছে। এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে করা মামলার ৮৫ শতাংশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের এক পরিসংখ্যানে ঢাকায় প্রায় ১২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজদের নাম উঠে এসেছে। নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২০ মাসে মহানগরে চাঁদাবাজির ৩৬৫টি মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আর ১৫ শতাংশ মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানায় ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি মামলা মোহাম্মদপুর থানায়, এরপর রয়েছে যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা থানা। মোট মামলার মধ্যে ৪২৫টির তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলো এখনও তদন্তাধীন। যদিও অনেক ভুক্তভোগী প্রাণনাশের ভয়ে থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পান না, যার ফলে প্রকৃত চাঁদাবাজির সংখ্যা তথ্যের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ঘটনার সত্যতা পাচ্ছে। তদন্তাধীন রয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ মামলা।

ডিএমপির থানা, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি) এবং কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বিত তালিকায় ১ হাজার ২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজের নাম উঠে এসেছে। এই গ্রুপের মধ্যে ১৪৮ জন সদস্য আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, কেবল তালিকা তৈরি বা বিক্ষিপ্ত গ্রেপ্তারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, আবার যাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে, এমন বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি অপরাধ দমনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তালিকায় থাকা অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের মধ্যে শামীম, জাকির হোসেন, আবুল বাশার বাদশা, কায়সার ওরফে গলাকাটা কায়সার, মহারাজ মিয়া, শফিকুল ইসলাম হেলাল, তানভীর, আরিফ হোসেন রিপন, আবু সাঈদ রাসেল, কাওসার মোল্লা ওরফে কানা কাওসার, সায়মন, বরিশাইল্যা শান্ত, নাহিদ, মামুন, রাব্বী, মিনহাজ, আরিফ ওরফে পিস্তল আরিফ ও শুভ ওরফে ঘাতক শুভ অন্যতম। এছাড়া সুব্রত বাইনের গ্রুপের মাহফুজুর রহমান বিপু, আরাফাত ইব্নে নাসির, শরীফ ও মধুর নামও রয়েছে তালিকায়। স্থানীয় সূত্রে ফেন্সি বাশার, শুটার নয়ন ও ড্রাইভার ওসমানের মতো ব্যক্তিদের নামও আলোচনায় আছে।

চকবাজার এলাকায় মো. সালাউদ্দিন ওরফে বিয়ার সালাউদ্দিন ও হাসান সারোয়ার পিলু এবং সবুজবাগ এলাকায় রিফাতুল্লাহ নাঈম, হৃদয় সরকার, মো. সাঈদ, শফিকুল ইসলাম ও নুরুন্নবী বাবুর মতো ব্যক্তিদের নাম পুলিশের তালিকায় সক্রিয় হিসেবে রয়েছে। খিলগাঁও এলাকায় মকবুল হোসেন, মিন্টু ওরফে কিলার মিন্টু, আলিফ ও শুভ ওরফে রিপনও চাঁদাবাজিতে যুক্ত। এদের মধ্যে অনেকে আবার কিশোর গ্যাংয়ের সহায়তায় তাদের অপকর্ম পরিচালনা করছে। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার করে চাঁদাবাজরা পার পাওয়ার চেষ্টা করছে।

পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মুখ চাঁদাবাজিতে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এই অপরাধ চক্রগুলো টিকে থাকছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করার ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে নারাজ। এই চক্রগুলোকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা পর্যন্ত রাজধানীতে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।