
ফুটবলের সবুজ গালিচায় নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটলেও আর্থিক আয়ের শীর্ষে এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন দুই অভিজ্ঞ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের তালিকায় যথারীতি প্রথম দুটি স্থান দখল করে আছেন তারা। টানা চতুর্থ মৌসুম এবং গত ১৩ বছরের মধ্যে ১২তমবারের মতো আয়ের লড়াইয়ে শীর্ষ দুটি নাম এই পর্তুগিজ ও আর্জেন্টাইন তারকা। ফুটবলের রাজদণ্ড কি তবে নতুন প্রজন্মের হাতে চলে গেছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও তখন দর্শকের কাতারে। ফুটবলের মঞ্চে যেন নতুন যুগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেসি-রোনালদো বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ফুটবলের আর্থিক সাম্রাজ্যে তাঁদের সিংহাসন এত সহজে দখল করা যাবে না। রোনালদোর আর্থিক সাম্রাজ্যের বিশালত্ব বোঝাতে আরেকটি তথ্যই যথেষ্ট। এখন তিনি নিজেই যেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। ‘মেসি ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়া এক জাদুকর, আর রোনালদো...’।
তালিকার শীর্ষে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চলতি বছরে আনুমানিক মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ডলারে। এর মধ্যে মাঠের পারফরম্যান্স ও বেতন থেকে তিনি পাচ্ছেন ২৫ কোটি ডলার এবং মাঠের বাইরের বিভিন্ন খাত থেকে আসছে ৫ কোটি ডলার। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসর থেকে চুক্তি অনুযায়ী বেতন ও বোনাস বাবদই তিনি বিপুল এই অর্থ উপার্জন করছেন। গত বছর তার আয় ছিল ২৮ কোটি ডলার, যা এক বছরে ২ কোটি ডলার বেড়েছে। কিন্তু ফুটবল তো শুধু মাঠের খেলা নয়। মেসি না রোনালদো: বয়স ৩০ পেরোনোর পর কে বেশি ভালো। আর বিভিন্ন পণ্যের প্রচার ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে আসবে আরও ৫ কোটি ডলার। রোনালদোর আয় শুনলে চোখ কপালে উঠতে পারে। একসময় রোনালদোর পরিচয় ছিল দুর্দান্ত এক গোলমেশিন। দুই কিংবদন্তির ব্যবসায়িক দর্শন আলাদা।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও রোনালদো গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাম্রাজ্য। ‘সিআর সেভেন’ ব্র্যান্ডের অধীনে বিভিন্ন পণ্য এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগে সফল এই ফুটবলার চলতি বছরের শুরুতে প্রথম সক্রিয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে কর বাদে ক্যারিয়ারে মোট ২০০ কোটি ডলার উপার্জনের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
অন্যদিকে, তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা লিওনেল মেসির এ বছর আনুমানিক আয় ১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ইন্টার মায়ামি থেকে বেতন হিসেবে তিনি পান প্রায় ৭ কোটি ডলার, তবে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে তার উপার্জন আরও বেশি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও ক্লাব মালিকানার অংশীদারত্ব থেকে মেসির আয় সাড়ে সাত কোটি ডলার। গত বছর ১৩ কোটি ডলার আয় করা মেসি আগামী এক বছরের মধ্যে ক্যারিয়ারে ২০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক ছোঁয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। আর্জেন্টাইন মহাতারকা রোনালদোর মতো নিজের নামকে কেন্দ্র করে বিশাল ব্র্যান্ড গড়ে তোলার চেয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আর ব্যবসায়িক বিনিয়োগে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। একজন নিজের নামকেই বানিয়েছেন ব্র্যান্ড, অন্যজন বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক আর বিনিয়োগকে করেছেন আয়ের অন্যতম ভিত্তি।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ ফুটবলারের সম্মিলিত আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত বছর তাঁর আয় ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের মতো।
তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই মোট অংকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারই রোনালদো ও মেসির পকেটে যাচ্ছে।
করিম বেনজেমা আল হিলালের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ফ্রি এজেন্ট হয়ে যাওয়ায় শীর্ষ দশ থেকে বাদ পড়েছেন, যার ফলে গত বছরের ৯৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্মিলিত আয়ের তুলনায় এবার মোট অংক কিছুটা কমেছে।
বেনজেমার স্থানে ৯ নম্বরে যুক্ত হয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ ফরোয়ার্ড হ্যারি কেইন।
পুরোনো তারকাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও আয়ের অঙ্কে দ্রুত এগিয়ে আসছেন। রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ১০ কোটি ডলার আয় নিয়ে উঠে এসেছেন তিন নম্বরে। মাঠ থেকে ৭ কোটি এবং মাঠের বাইরে থেকে ৩ কোটি ডলার পান তিনি, যা গত বছরের চেয়ে ৫০ লাখ ডলার বেশি। ২০২২ সালে পিএসজির সঙ্গে চুক্তির সময় বড় অঙ্কের বোনাস পেয়ে তিনি রোনালদো-মেসিকে টপকে এক নম্বরে উঠে এসেছিলেন।
তালিকার চার নম্বরে অবস্থান করছেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড, যার বর্তমান আয় ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ক্লাব বেতন-বোনাস থেকে ৬ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে আড়াই কোটি ডলার আসে। ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২৬ থেকে ২৭ বছর বয়সী এই তিন তরুণের বাণিজ্যিক মূল্য মাঠের নৈপুণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
তবে বয়সের তুলনায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছেন বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। ফোর্বসের তালিকায় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় নিয়ে তিনি অবস্থান করছেন ছয় নম্বরে। আমেরিকান ঈগল, কোকা-কোলা ও ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন চুক্তি করায় তার আয় এক বছরে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার বেড়েছে; গত বছর যা ছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত জুলাইয়ে লিওনেল মেসিকে দর্শক বানিয়ে লামিনে ইয়ামাল যখন বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন অন্তত তেমনই মনে হয়েছিল।
মাঠে ট্রফি জয় বা গোল করার পরিসংখ্যানে তরুণদের দাপট স্পষ্ট হতে শুরু করলেও, অর্থনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে ফুটবল বিশ্বকে এখনো নিয়ন্ত্রণ করছেন রোনালদো ও মেসি। বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকাদের অর্থনৈতিক রাজত্ব দখলের লড়াই অব্যাহত থাকলেও, ব্যাংক ব্যালেন্স ও আয়ের দিক থেকে সাবেক দুই সম্রাটের আধিপত্য এখনো অটুট। সেখানে গোল নেই, অ্যাসিস্ট নেই, ট্রফিও নেই। আর সেই খেলায় এখনো দুই বৃদ্ধ সিংহের দাপট। ফুটবল মাঠে গোল করার পাশাপাশি ব্যবসার মাঠেও যে তিনি সমান দক্ষ, সেটি আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.