১১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্তান থাকতেও অসহায় বৃদ্ধা ফুলি, পাশে দাঁড়িয়েছে ‘বাতিঘর’

Published: September 26, 2026, 2:16 pm

পরিবার ও সন্তান থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসে একাকী ও মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সত্তোরোর্ধ্ব বৃদ্ধা ফুলি। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে নিজের পরিচয়টুকুও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না তিনি। গত বুধবার বিকেলে সরাইল সদর ইউনিয়নের বড্ডাপাড়া গরুর বাজারের সামনে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। খবর পেয়ে সরাইল সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সন্তান ও পরিবার থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকী ও অসহায় দিন কাটাচ্ছেন ৭০ বছরের বেশি বয়সি ‘ফুলি’।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টানা দুই দিন চিকিৎসার পর বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বাস্থ্যকর্মী রাসেল চৌধুরী ও অ্যাম্বুলেন্সচালক জাকিরুল ইসলাম তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। গত শুক্রবার রাত সোয়া ১০টার দিকে তাঁকে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাতিঘর’-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ওই বৃদ্ধার জন্য ওষুধপত্র, খাবার, বালিশ ও চাটাইসহ প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বৃদ্ধা ফুলি এর আগেও দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন তাঁর ছেলে বাঁশের মইয়ে বহন করে তাঁকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর ছেলে বা পরিবারের কোনো সদস্যের দেখা মেলেনি। ছেলের খোঁজ না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো স্বজন হাসপাতালে তাঁর দায়িত্ব নিতে আসেননি। সে সময় তার ছেলে বাঁশের মই দিয়ে বহন করে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।

সরাইল সদর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার জানান, ভুক্তভোগী বৃদ্ধার বাড়ি সরাইল সদরের উচালিয়াপাড়া গ্রামে। তিনি বলেন, ‘আমরা স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছি তাঁর একটি ছেলে রয়েছে, তবে ঘটনার পর থেকে তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর সন্ধান চালানো হচ্ছে। ছেলেকে খুঁজে পাওয়া গেলে মায়ের বিষয়ে বিস্তারিত জেনে আইনানুগ ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ তবে ছেলেটিকে এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবিক বিবেচনায় এই বৃদ্ধার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আজাহার উদ্দিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, পরিবারের স্বজনরা এগিয়ে না এলে বাতিঘরের পক্ষ থেকেই তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে সুস্থ করে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে এবং পরবর্তীতে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হবে। ভর্তির পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবার, পানি, চাটাই, বালিশসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আজাহার উদ্দিন আরও বলেন, ‘একজন মা জীবনের শেষ দিনগুলোতে সন্তানের অবহেলায় এমন কষ্ট পাবেন—এটি কারও কাম্য নয়। মা-বাবার সেবা করা সন্তানের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের আহ্বান থাকবে, সংশ্লিষ্টরা যেন দ্রুত মায়ের পাশে এসে দাঁড়ান।’ একইসঙ্গে বৃদ্ধার প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হতে এবং পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করতে সমাজের সচেতন মানুষের সহায়তা কামনা করেছেন তিনি। যে মা-বাবা সন্তানকে স্নেহে আগলে বড় করেন, অসুস্থ হলে রাত জেগে সেবা করেন এবং নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেন—বৃদ্ধ বয়সে সেই মা যখন অসহায় হয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানো সন্তানের প্রাথমিক দায়িত্ব।