
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের পাশাপাশি এখন এক ভিন্ন ধরনের প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছেন। ইয়েমেনের এক ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পীও এ বিষয়ে গান বাঁধেন। সহিংসতা, ক্ষুধা ও রোগের কারণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুতেও ভূমিকা রয়েছে সৌদি সামরিক অভিযানের।
সৌদি রাজপরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁরা সবাই যে অর্থের বিনিময়ে কাজ করেন তা নয়, তবে প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে দিতে ঠিকই বড় ভূমিকা রাখেন।
মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত এপস্টিন-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রের সূত্র ধরে হুতিরা এই প্রচার চালাচ্ছে যে, সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পবিত্র কাবার গিলাফ এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে পাঠিয়েছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে মারা যান, যাকে সেসময় আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ফাইল প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। মার্কিন দূতাবাসের কিছু কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সৌদি আরব ছাড়ার নির্দেশ।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল যে, হুতিরা পবিত্র মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে উসকে দিতেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো হয়েছে। তবে হুতি বিদ্রোহীরা সরাসরি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। উল্টো হুতি প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলে দাবি করেন, যারা এপস্টিনকে কাবার গিলাফ উপহার দিয়েছিলেন, তারাই মূলত মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ এই পাল্টা অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। দেশটির ভাষ্য, এ লজ্জাজনক হামলার উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের উসকে দেওয়া।
হুতিদের এই প্রচার কৌশল এখন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টেলিভিশন ও রেডিও পর্যন্ত বিস্তৃত। এমনকি ২ লাখ ৭০ হাজার অনুসারী থাকা এক ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতাও এ বিষয়ে ভিডিও তৈরি করেছেন, পাশাপাশি স্থানীয় সংগীতশিল্পীরা এ নিয়ে গানও বেঁধেছেন। হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি বিভিন্ন ভাষণে নিয়মিতভাবে এপস্টিনের নাম উচ্চারণ করছেন। গত ফেব্রুয়ারির এক বক্তব্যে তিনি এপস্টিনের ফাইলগুলোকে গুরুত্বসহকারে দেখার আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, এর মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের ও অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে জায়নবাদী আঁতুড়ঘরের সম্পর্ক উন্মোচিত হচ্ছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। হুতিদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণেও বারবার এপস্টিনের প্রসঙ্গ আসছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে চালানো হামলার প্রশংসা করে চলতি মাসে দেওয়া ভাষণেও এপস্টিনের কথা উল্লেখ করেন হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল নিয়ে সেপ্টেম্বরের ভাষণেও তিনি এপস্টিনের প্রসঙ্গ তোলেন। এগুলো এমন এক জায়নবাদী আঁতুড়ঘর উন্মোচন করে, যা নেতা ও অভিজাতদের গড়ে তোলে।’। একই সঙ্গে ইহুদি ও জায়নবাদীরা বিশ্ব পরিচালনা করে, এমন ইহুদিবিদ্বেষী ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ ছড়াতেও তাঁর নাম কাজে লাগানো হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, হুতিরা এখন অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তাদের এই প্রচারণার পেছনে কাজ করছে এক নিবেদিত মতাদর্শিক দল। আল-বাশার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপস্টিনকে ব্যবহার করে হুতিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুর্নীতির প্রতীক তুলে ধরছে এবং একই সঙ্গে ইহুদিবিরোধী বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষক মোস্তফা আয়াদ মনে করেন, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ককে সামনে রেখে হুতিরা নিজেদের সংঘাতকে পশ্চিমা অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। হুতিদের শক্তি কোথায়, বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধে জড়িয়েও কেন পিছু হটল যুক্তরাষ্ট্র।
মূলত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাবমূর্তিকে বিতর্কিত করা এই প্রচারণার অন্যতম মূল লক্ষ্য। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করলে হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যমতে, চলমান সংকটে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং গত আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এসব হামলায় অন্তত ২২ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিরা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও বিমান চলাচল লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে বাইরের দেশের হামলা ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবে সেনা পাঠাতে পারে মিসর, পেছনের কারণ কী।
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শিরিন জাহান, সম্পাদক ও প্রকাশক : ফেরদৌস আহমদ,,
সহযোগী সম্পাদক : আহমাদ আর রাফি রাতুল, আহমাদ আর রাফি রাহী।
মেইল: editor@kongstime.com
মোবাইল: 01567927369
Copyright © 2026 kongsotime.com. All rights reserved.