
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র নয় মাসে ৪ হাজার ৬০ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফেরত এসেছে। এই হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ১৪ জনের বেশি প্রবাসীর মরদেহ দেশে আসছে। প্রবাসে কর্মীর মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা এবং মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর সৌদি আরবে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মারা গেছেন, যদিও সেখানে কর্মসংস্থানের হারও অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এরপরই রয়েছে মালয়েশিয়ার অবস্থান, যেখানে আড়াই বছর ধরে নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ রয়েছে। এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ।
মরদেহ আনার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার একটি উদাহরণ পাবনার আল আমিনের ঘটনা। কম্বোডিয়ার একটি টাইলস কারখানায় কাজ করার সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল তিনি মারা যান। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। মৃতের শ্যালক মাসুম খান জানান, কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় মরদেহ উদ্ধারে ও দেশে পাঠাতে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করতে হয়েছে তাঁদের। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসে মৃত কর্মীদের মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব পালন করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হওয়ায় সময় কিছুটা বেশি লাগে। তবে যেসব দেশে দূতাবাস নেই, সেখান থেকে মরদেহ ফেরাতে জটিলতা অনেক বেশি। ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৪০ জন এবং ২০২১ সাল থেকে পুনরায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। করোনা মহামারির সময় অনেক মরদেহ গন্তব্য দেশেই দাফন করা হয়েছিল। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। করোনাকাল বাদ দিয়ে সাধারণ সময় মৃতের ১ শতাংশের কম দাফন হয় গন্তব্য দেশগুলোতে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, বিদেশে অধিকাংশ মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ দেখানো হয়, যা নিয়ে পরিবারের মনে অস্বস্তি রয়েছে। এ বছর দেশে আসা মরদেহগুলোর মধ্যে ৬৬ শতাংশের ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, ভবন থেকে পতন ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৬ শতাংশের বেশি মৃত্যু হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে আসা ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই ছিল বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার, যার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬৪৯ জনের।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনার লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে এবং অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ ফেরাতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, আবেদনের পর থেকে সরকারি দপ্তরে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় পরিবারকে। নিয়ম অনুযায়ী, বিএমইটি ছাড়পত্র বা দূতাবাস নিবন্ধন থাকলে কল্যাণ বোর্ড খরচ বহন করে। এরপরও দাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তার পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান ও বিমা সুবিধা দেওয়া হয়। এ বছর প্রথম ছয় মাসে বিমা বাবদ ৪৪ কোটি এবং ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বাবদ ৭৫ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অবকাঠামো নির্মাণ খাতে কর্মরত প্রবাসীদের প্রচণ্ড তাপ ও কর্মঘণ্টার চাপ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিডনি, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতায় অকাল মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকেরাও প্রাণ হারাচ্ছেন। তাই প্রতিটি মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কর্মী অনিয়মিত হলেও তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পুরো দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
বর্তমানে বিদেশ গমনের আগে বিএমইটি যে তিন দিনের প্রশিক্ষণ দেয়, তা কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা সচেতনতা এবং শারীরিক সক্ষমতা ঠিক রাখার কৌশল সম্পর্কে আরও নিবিড় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। বিদেশ থেকে সব হারিয়ে ফিরে আসা কর্মীরা যাতে সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।





