
১৯৭৬ সালের মহালয়ার ভোরটি ছিল বাঙালির বেতার ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী ও উত্তেজনাকর সময়৷ দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে সেবার আকাশবাণী কলকাতা তাদের চিরাচরিত অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রচারের বদলে নিয়ে এসেছিল ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’ শীর্ষক এক নতুন প্রযোজনা৷ এই আয়োজনে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিবর্তে মহানায়ক উত্তমকুমারের কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল দেবীস্তোত্র৷ সেই ভোরে রেডিও খুলতেই শ্রোতারা স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে কণ্ঠের মাধ্যমে শারদীয়ার আগমনী বার্তা শুনে অভ্যস্ত ছিল, তাকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া কেউই সহজভাবে নিতে পারেননি৷ মহানায়কের কণ্ঠেও তাঁরা ফিরে পেলেন না তাঁদের চেনা মহালয়ার ভোর। কিন্তু যে কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পুজোর আগমনী শুনিয়েছে, তার জায়গা নেওয়া কি এত সহজ। শরতের হিম হিম ভোর, জানালার বাইরে অন্ধকার, ঘুমজড়ানো চোখ আর রেডিও থেকে ভেসে আসা সেই উচ্চারণ—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর…’। পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিবারে মহালয়ার সকাল শুরু হয় এই অনুষ্ঠান শুনে। দুর্গাপূজার আবহের সঙ্গে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এমনভাবে মিশে গেছে যে অনুষ্ঠানটি বদলানো মানে যেন পরিচিত ভোরটিকেই বদলে দেওয়া। তখনো জাতীয় বেতারের জন্য ‘আকাশবাণী’ নামটি গ্রহণ করা হয়নি।
এই ঘটনার নেপথ্য ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় বেতার পরিচালনার ভার সরকারি হাতে অর্পিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘আকাশবাণী’ নাম ধারণ করে। মহালয়ার ভোরের অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩২ সালে, যখন বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য) মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর অনুপ্রেরণায় ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি গদ্য-পদ্যময় কাব্য রচনা করেন। পণ্ডিত হরিশচন্দ্র বালী ও পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরে এবং রাইচাঁদ বড়ালের সংগীত পরিচালনায় সেই গীতিআলেখ্যই কালক্রমে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়, যা ১৯৩৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নামাঙ্কিত হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে শ্লোকপাঠ এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা বাঙালি শ্রোতার মজ্জায় মিশে গিয়েছিল।
পরিবর্তনের সেই স্রোত আসে ১৯৭৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে সরিয়ে উত্তমকুমারকে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে পঙ্কজকুমার মল্লিকের স্থলাভিষিক্ত হন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। নতুন এই আয়োজনে যুক্ত হয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা। সংগীত পরিমার্জনায় ছিলেন পণ্ডিত ভি বালসারা ও শ্যামল গুপ্ত। আয়োজনটি জাঁকজমকপূর্ণ হলেও শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি, বরং বেতার ভবনে আসতে থাকে একের পর এক আপত্তির চিঠি ও টেলিফোন। রচনাটি বেতারে সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়।
জনপ্রিয় উপস্থাপক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, অনুষ্ঠান চলাকালীনই আকাশবাণীতে তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল। এমনকি অনুষ্ঠান শেষে বেতার কেন্দ্রের ফটকে জনতা ভিড় জমিয়ে নিজেদের অসন্তোষ জানানোর চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষকে ষষ্ঠীর দিন পুনরায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মূল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রচার করতে হয়েছিল। এই গোটা ঘটনাটিই উঠে এসেছে সৌমিক সেনের ‘মহালয়া’ সিনেমায়, যা শিল্পী ও প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্বের এক দলিল হয়ে আছে। নতুন আয়োজনের বড় আকর্ষণ ছিলেন সে সময়ের জনপ্রিয় তারকারা।
সিনেমাটিতে উত্তমকুমারের চরিত্রে যিশু সেনগুপ্তের অভিনয় বেশ প্রশংসিত হয়েছে। তিনি উত্তমকুমারের দ্বিধা ও অস্বস্তির জায়গাটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। মহানায়ক নিজেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন, তবে শ্রোতাদের এই অমোঘ ভালোবাসার কাছে প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চরিত্রের জন্য শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এক অনবদ্য অভিনয় উপহার দিয়েছেন। তাঁর নীরবতা ও শরীরী ভাষায় লুকিয়ে থাকা আত্মমর্যাদা এবং বেদনার প্রকাশ ছিল সিনেমার অন্যতম বড় প্রাপ্তি।
অন্যান্য চরিত্রের ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকায় সপ্তর্ষি রায় এবং পঙ্কজকুমার মল্লিকের ভূমিকায় শুভময় চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় সাবলীল ছিল। তবে আমলা শশী সিংহের চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় কিছুটা একমাত্রিক মনে হতে পারে, কারণ সেখানে কেবল ক্ষমতার দাপটকেই বড় করে দেখানো হয়েছে। সাবেক যুগ্ম সচিবের ভূমিকায় কাঞ্চন মল্লিকের অভিনয় ছিল বেশ স্বচ্ছন্দ ও স্বাভাবিক। পুরো নির্মাণে পুরোনো কলকাতার আবহাওয়া ও বেতার কেন্দ্রের পরিবেশ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
পরিচালক সৌমিক সেন প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা শিল্পীর মর্যাদা ও শ্রোতাদের আবেগের সংঘাতটি সুন্দরভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন। তবে অতিরিক্ত ব্যাখ্যামূলক সংলাপে কখনো কখনো গল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা বিঘ্নিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, ছবিটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘদিনের শারদীয় স্মৃতির এক মেলবন্ধন। শিল্পী ও শ্রোতাদের পারস্পরিক সম্পর্কের যে গভীরতা এখানে স্পষ্ট হয়েছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক। পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭৬ সালের সেই ভোরেই প্রমাণিত হয়েছিল যে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠই বাঙালির মহালয়ার প্রকৃত প্রাণ।





