৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্র ও সমাজে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

Published: October 19, 2026, 3:52 pm

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরাও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধা তাদের বীরত্বের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় খেতাবও অর্জন করেন। তবে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার শুধুমাত্র ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। সংবিধানের সেই অনুচ্ছেদে বলা হয়, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালি জাতির ঐক্যই হবে জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। স্পষ্টতই, এই সংজ্ঞা নির্ধারণের মাধ্যমে পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এর ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২। প্রথমত, আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, আমাদের উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর সমাজ ও রাষ্ট্রের যথার্থ গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের আপন আপন ইতিহাসকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী বয়ান থেকে মুক্ত করে, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ভিত্তিতে, নিজেদের ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে হবে। বিভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ধরন ও গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণপদ্ধতি থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ ও প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করা আবশ্যক।

তৎকালীন শাসকশ্রেণির জাতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই প্রবল ছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমান অবাঙালি জাতিসত্তাগুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে নিম্নমর্যাদায় চিহ্নিত করেন এবং তাদের ‘বাঙালি’ হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘নিছক ট্রাইব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ওপর বাঙালি পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার সেই আকাঙ্ক্ষা মূলত ছিল বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের এই প্রবণতা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের সঙ্গে তুলনীয়। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করা হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনায় সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে ডাকার উপনিবেশবাদী নেতিবাচক অভ্যাসটিই বজায় রাখা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed। বলার অপেক্ষা রাখেনা, এই সব উৎকৃষ্টতাবাদী জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মূলত আধিপত্যবাদ এদেশের শাসকশ্রেণীর ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনারই বিভিন্ন অভিপ্রকাশ মাত্র।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এক বিতর্কিত ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি হলেও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি। এর ফলে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় কার্যত বাঙালি পরিচয়ের অধীনেই রয়ে যায়। একইসঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করাটা এক প্রকার স্ববিরোধিতা। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মবিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অধস্তন অবস্থায় রাখা কোনোভাবেই একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচায়ক হতে পারে না। কিন্তু তখনো বাঙালি শাসকশ্রেণির দিক থেকে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী চিন্তাপ্রসূত নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করা হতো – আজও তা অব্যাহত রয়েছে।এ বিষয়ে সমাজে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার। 2011. একদিকে লীগ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রের একটি মূলনীতি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতাকে’ ফিরিয়ে আনে, অন্যদিকে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে অক্ষুণ্ন রাখে। সর্বোপরি, যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্ম-বিশ্বাসকে ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ দান করে সংখ্যালঘু নাগরিক সম্প্রদায় সমূহের ধর্ম বিশ্বাসকে অধস্তন স্তরে নামিয়ে আনে, সে প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চয় ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ থাকে না।

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় দীর্ঘ ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনীতির মাধ্যমে যেভাবে শোষণের ধারা বজায় রেখেছিল, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট তারই ধারাবাহিকতা। ঔপনিবেশিক শক্তির ফেলে যাওয়া এই নেতিবাচক প্রভাব রাষ্ট্র ও সমাজের বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক আনিসুজ্জামান তার ‘আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি’ এবং ড. মিজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত ‘দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’র মতো বিভিন্ন নথিপত্রে এই জাতিগত ও রাজনৈতিক জটিলতার কথা উঠে এসেছে। ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার বোধোদয়ের মতো গ্রন্থে ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যা আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্ব বুঝতে সহায়তা করে। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে।

উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস অনুধাবন করা জরুরি। তবে লক্ষ্য কেবল পুরনো ইতিহাসকে অভিসম্পাত দেওয়া নয়, বরং ঔপনিবেশিক কাঠামোর অবশেষ থেকে মন ও মননকে মুক্ত করে নতুন ও সৃজনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করা। বাংলাদেশসহ যেসব রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কবলে আছে, তাদের মুক্তি পেতে হলে শাসকশ্রেণি ও জনগণের মনস্তাত্ত্বিক বিউপনিবেশায়ন ঘটাতে হবে। সাম্যভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে হলে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং ধর্মীয় আধিপত্যবাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব।