
পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের এই বাসিন্দা শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ মেয়ের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর মরদেহ দাফন ঘিরে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছে তার পরিবার। পিরোজপুরে প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু লাশ কীভাবে দাফন করব, সে বিষয়ে ইউএনও কোনো দায়িত্ব নেননি।
মানিক পশারীর জামাতা ফারুক হোসেন জানান, তার শ্বশুর একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে গেলে তাকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তাকে প্রকাশ্যে সম্মান জানানোর কোনো পরিবেশ ছিল না। একপর্যায়ে কোনো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা ছাড়াই তাকে পুলিশ লাইনসের ভেতর গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে দাফন কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। তারা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। একটি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ বা চা-পাতা ছাড়া ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর কোনোমতে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। দুপুরে মরদেহটি সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নেওয়া হলে সেখানে স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা জড়ো হন। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেখানে সাংবাদিকসহ অন্যদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বিস্তারিত জানতে ইউএনও মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীমের অফিশিয়াল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। শেষ পর্যন্ত সেই মামলায় সাঈদী সাহেব জেলেই ইন্তেকাল করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পুলিশ লাইনসে আনুষ্ঠানিক সম্মান জানানোর পর অ্যাম্বুলেন্সটি সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে তারা কাউকে দেখেননি। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পুলিশি পাহারায় লাশটি নিয়ে যাওয়া হয়। শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত তার মরদেহ দাফন সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে যথাযথ নিয়মে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে উল্টো অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে যে, মানিক পশারী মিথ্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে দীর্ঘকাল কারাবন্দি রেখেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মানিক পশারী মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে পিরোজপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল মামলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে মানিক পশারী আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে দীর্ঘকাল জেলে আটকে রেখেছিলেন। সেখানেই গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেছিলেন মানিক পশারী। এদিকে মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুর রাজ্জাক।





