১১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের কড়া প্রতিবাদ

Published: October 26, 2026, 10:39 pm

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের সম্প্রতি করা একটি মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতে পুলিশ পিছপা হবে না—এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে, এই ধরনের বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হিসেবে বৈধতা দেওয়ার একটি বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। ঐ সময়ে ভিন্নমভাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতা কর্মী সহ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় এড়াতে পুলিশ প্রধান ক্রসফায়ারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যা ব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অতীতের এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের কাজ হলো পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের মুখোমুখি করা। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার কোনো নির্বাহী সিদ্ধান্তে খর্ব করা সম্ভব নয়। পুলিশের কোনো আইনগত এখতিয়ার নেই বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের। টিআইবি মনে করে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী যেখানে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে সরকার ক্রসফায়ারের পথে যাবে না, সেখানে আইজিপির এই ধরনের বক্তব্য সরকারের ঘোষিত অবস্থানের সাথেও সাংঘর্ষিক।

সংস্থাটি অবিলম্বে আইজিপির কাছ থেকে এই বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। টিআইবি জোর দিয়ে বলেছে যে, পুলিশ বাহিনীর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার নামে সমালোচনার পথ বন্ধ করা গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি, পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনার বিষয়টিকেও তারা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি।

অধিকার তাদের বিবৃতিতে জানায়, বিগত ১৫ বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের ব্যাপক ঘটনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করা হয়েছে, যার বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। অধিকারের মতে, পুলিশ প্রধানের এই মন্তব্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। ওদিকে, বিবৃতিতে অধিকার জানায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার সাড়ে ১৫ বছর শাসনামলে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র‌্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল চরম ও অনিবার্য পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচানোর জন্য অনুমোদিত। এই সীমিত সুযোগকে ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করা আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী। টিআইবি ও অধিকারের দাবি, পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পুলিশকে অবশ্যই আইনের শাসন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় অভিযুক্তদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।