১২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্থানীয় সরকারের ৬৬ খাতে ২৮ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতি

Published: October 27, 2026, 11:09 pm

গত ১৭ বছর ধরে স্থানীয় সরকার খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক-কালভার্ট নির্মাণ, সরকারি নিয়োগ, ঠিকাদারি বিল পরিশোধ ও রাজস্ব আদায়ে ২৭ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি তদন্ত কমিটি ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৬টি ভিন্নধর্মী খাতে এসব অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র তুলে ধরেছে। বিষয়টি অধিকতর নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের জন্য গত ১৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা সাড়ে ১৫ বছর এবং পরবর্তী সময়ের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে এলজিইডি, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন অনিয়ম বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

সরকারি নথিপত্র, অডিট প্রতিবেদন ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে, যদিও অভিযোগ উঠলেই তা অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয় না; বরং দায় ও আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে পরবর্তী তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া জরুরি। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে পৃথক তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি মোটরযান ক্রয় ও মেরামত, অনুমোদিত কাঠামোর বাইরের জনবলকে বেতন দেওয়া এবং সড়ক-কালভার্ট নির্মাণে নানা অসংগতি ধরা পড়েছে। এর মধ্যে তিনটি মোটরযান কেনা ও ব্যয়সংক্রান্ত ঘটনায় ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা, গাড়ি মেরামত বাবদ চালকের ব্যাংক হিসাবে ২৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং কাঠামোর বাইরের জনবল বাবদ ৪৮ কোটি ১০ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি কালভার্ট নির্মাণ না করেই ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, গাজীপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে রাজস্ব আদায়, ভ্যাট-কর জমা, ঠিকাদারি বিল ও নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রোড কাটিং ফি থেকে আদায় করা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় দণ্ডসুদসহ ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং ২০১৫-১৭ অর্থবছরের অন্যান্য সেবার ভ্যাট জমা না দেওয়ায় ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া উল্লিখিত সিটি করপোরেশনগুলোতে কাজ পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে। একই সিটি করপোরেশনের ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আরও কিছু কাজ ও সেবার বিপরীতে ভ্যাট কর্তন এবং জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নির্মাণকাজে নির্মাণসামগ্রী পরীক্ষা না করেই ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৪৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল পরিশোধের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

সিটি করপোরেশনগুলোর বাজার, মার্কেট ও স্থাপনা ভাড়া আদায়েও শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, রংপুর, বরিশাল ও খুলনা সিটি করপোরেশনের স্থাপনার ভাড়া থেকে ১৮৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর বাইরে ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায় না করার ঘটনায় ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং দোকানভাড়া বাবদ ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশনে প্রকল্পের অব্যবহৃত ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে অন্য তহবিলে স্থানান্তরের ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাবেক মেয়রদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে প্রতিবেদনে। গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার যোগসাজশে ৬৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার অনিয়মের উল্লেখ আছে। এছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের আমলে নিয়োগ-বাণিজ্য ও ক্ষমতা অপব্যবহার এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাজার ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নসরুলের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার টয়লেট নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

পানির গুণগতমান পরীক্ষা প্রকল্পে ২৪ কোটি টাকা বিল পরিশোধে অনিয়ম এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৩) প্রায় ৫৮ কোটি টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম পাওয়া গেছে, যেখানে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা শতাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে জরিমানা আদায় না করে তা মওকুফ করা হয়েছে।