২০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনায় চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

Published: November 5, 2026, 3:05 pm

খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে প্রবেশ করলেই নাকে আসে চুইঝালের তীব্র ও ঝাঁজালো সুবাস। মরিচজাতীয় উদ্ভিদ না হলেও রান্নায় ঝাল ও স্বাদ বাড়াতে পানের নিকটাত্মীয় এই লতাটির তুলনা মেলা ভার। পর্তুগিজরা এ দেশে মরিচ আনার আগে থেকেই উপমহাদেশের রান্নায় চুইঝালের ব্যাপক প্রচলন ছিল। কালের পরিক্রমায় এর ব্যবহার খুলনা ও যশোর অঞ্চলের বসতবাড়ির আঙিনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লেও, বর্তমানে এটি একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ নিয়েছে। রান্নাঘরের এই স্বতন্ত্র মসলা আসলে মরিচজাতীয় কোনো উদ্ভিদ নয়, এটি পানের নিকটাত্মীয়। পর্তুগিজদের হাত ধরে এ দেশে মরিচ আসার আগে উপমহাদেশের রান্নায় ঝাঁজ আনতে যেসব স্থানীয় মসলা ব্যবহৃত হতো, চুইঝাল তার অন্যতম। গরু, খাসি কিংবা হাঁসের মাংস রান্নায় চুইঝালের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। চুইঝালের অনন্য স্বাদ নিতে খুলনার বড় বাজারসংলগ্ন খাবার হোটেলগুলোতে ভিড় জমান ভোজনরসিকেরা।

গবেষণায় চুইঝালের বহুমুখী গুণের কথা উঠে এসেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, চুইয়ের নির্যাসে জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ক্যানসার-কোষ প্রতিরোধী উপাদান রয়েছে। এর ব্যবহার গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য, সর্দি-কাশি ও হজমের সমস্যার সমাধানে কার্যকর। এটি স্নায়বিক উত্তেজনা কমাতে এবং ক্ষুধা বাড়াতেও সহায়তা করে, যার ফলে রান্নায় এর চাহিদা ভোজনরসিকদের কাছে আকাশচুম্বী।

খুলনার বড় বাজারে অন্তত ১৫টি দোকান রয়েছে যারা শুধু চুইঝাল বিক্রি করে। এছাড়া অন্যান্য মসলার দোকানেও এর দেখা মেলে। বড় বাজারে দৈনিক এক হাজার কেজিরও বেশি চুইঝাল বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। প্রবীণ ক্রেতা অবনীন্দ্রনাথ কুমারের ভাষ্যমতে, আশির দশকে প্রতি কেজি চুই মাত্র ২ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, সাধারণ মানের চুই ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে উন্নত মানের শিকড় ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা অমল বিশ্বাস জানান, তিন বছর আগেও যেখানে ৮০০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুইঝালের উৎপাদন ৬০০ টন ছাড়িয়ে গেছে। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। কেজিপ্রতি গড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা দাম ধরে হিসেব করলে বর্তমানে বাজারের আকার ৭০ কোটি টাকার বেশি। তবে স্থানীয়দের মতে, আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরের লেনদেনসহ এই বাজার বাস্তবে প্রায় শতকোটি টাকার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় ১৫১টি সম্ভাব্য জিআই পণ্যের তালিকায় খুলনার চুইঝালকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য যে ১৫১টি জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের তালিকা প্রস্তুত করেছে, তাতে খুলনার চুইঝাল অন্যতম। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

চাহিদা বাড়ায় চাষিরা এখন আম, কাঁঠাল বা মেহগনি গাছের সাথে সাথি ফসল হিসেবে চুই চাষ করছেন। নার্সারিগুলোতেও চারা বিক্রির হিড়িক পড়েছে; কয়েক বছরের ব্যবধানে চারা বিক্রির সংখ্যা ২-৩ হাজার থেকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বৃহত্তর খুলনার বাইরে কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহেও এখন বাণিজ্যিকভাবে চুইয়ের আবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া হোটেল জাবেদসহ বড় বাজার সংলগ্ন রেস্তোরাঁগুলোতে চুই দিয়ে রান্না করা মাংসের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় প্রতিদিন কয়েক মণ চুইঝাল ব্যবহৃত হচ্ছে।