১১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়ন সাং-হোর নতুন জম্বি চলচ্চিত্র ‘কলোনি’: রোমাঞ্চ ও গভীরতার সংকট

Published: October 27, 2026, 11:40 am

দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা ইয়ন সাং-হো তাঁর নতুন সিনেমা ‘কলোনি’ নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন। ২০১৬ সালের সাড়া জাগানো ছবি ‘ট্রেন টু বুসান’-এর ধারাবাহিকতায় এটিও অতি দ্রুতগতির, রোমাঞ্চকর এবং ভীতিকর পরিস্থিতির গল্প বলে। সিনেমাটিতে জম্বিদের উপস্থাপন করা হয়েছে একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে; এরা শুধু হিংস্র নয়, বরং সম্মিলিতভাবে কৌশল নির্ধারণ ও চিন্তা করতে সক্ষম। জম্বি সিনেমার প্রচলিত ছক ভেঙে নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টায় এই ছবিটি নির্মাণ করেছেন তিনি।

গল্পের প্রেক্ষাপট সিউলের একটি বহুতল ভবনকে কেন্দ্র করে, যেখানে একটি বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন চলছিল। প্রতিষ্ঠানটি এমন এক ছত্রাক নিয়ে গবেষণা করছিল যা মৃত কোষকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং তথ্যের আদান-প্রদান করতে পারে। এই গবেষণার কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে সাবেক কর্মী সিও ইয়ং-চল (কু কিও-হোয়ান) প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সংক্রামক দিয়ে আক্রমণ করে। দ্রুত ভবনটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ভেতরে আটকা পড়া মানুষদের নিজেদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হয়। সেখানে একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন চলছে। গবেষণার কৃতিত্ব ও নিজের প্রতি অবিচারের অভিযোগ থেকে তার ক্ষোভের জন্ম। নিরাপদে বেরিয়ে আসতে হলে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করতেই হবে।

ছবিতে আটকে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিজ্ঞানী কওন সে-জং (জুন জি-হিউন), তাঁর প্রাক্তন স্বামী হান কিয়ো-সং (গো সু), নিরাপত্তা প্রহরী হিউন-সক (জি চ্যাং-উক) ও তাঁর বোন হিউন-হি (কিম শিন-রক)। বাইরে থেকে উদ্ধারকাজ পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় এই মানুষদের মুখোমুখি হতে হয় সংক্রমিতদের, পাশাপাশি নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস ও মতবিরোধের।

‘কলোনি’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সংক্রমিতদের দলগত বুদ্ধিমত্তা। সাধারণ জম্বি সিনেমায় আক্রান্তরা কেবল ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ শিকার করে, কিন্তু এখানে জম্বিরা একে অপরের কাছ থেকে কৌশল শেখে। প্রাণীদের দলগত আচরণের অনুকরণে তৈরি এই জম্বিরা যেন একটি বিশাল মস্তিষ্কের অংশ। একজনের অর্জিত অভিজ্ঞতা মুহূর্তের মধ্যে পুরো দলের কাছে পৌঁছে যায়, যা মানুষকে কোনঠাসা করার জন্য আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানে একজন জম্বি কোনো কৌশল শিখলে সেই তথ্য অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

নির্মাতা ভয় তৈরির জন্য মেকআপ ও বিশেষ প্রভাবের পাশাপাশি শরীরী অভিনয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নৃত্যশিল্পী ও শরীর বাঁকানোয় পারদর্শী কুশলীদের ব্যবহার করা হয়েছে সংক্রমিতদের চরিত্রে। ফলে তাদের চলাফেরা অস্বাভাবিক, কখনো পশুর মতো হামাগুড়ি দেওয়া কিংবা স্তূপাকারে জড়ো হওয়ার দৃশ্যগুলো দর্শকদের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। এই শারীরিক ভাষাকে চমৎকার কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আক্রান্তদের শরীর হঠাৎ একসঙ্গে কেঁপে ওঠা, অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে স্থির হয়ে যাওয়া কিংবা সম্মিলিতভাবে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যগুলো বেশ অস্বস্তিকর।

ছবির চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনা ভবনটির বিভিন্ন স্থান—যেমন বিপণিবিতান, অফিস, লিফট এবং সরু করিডরকে উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিপণিবিতানের দৃশ্যগুলো জর্জ এ রোমেরোর ‘ডন অব দ্য ডেড’-এর স্মৃতি মনে করালেও ‘কলোনি’ নতুন কৌশল যোগ করেছে। তবে জম্বিদের ভয়ংকর রূপের পাশাপাশি ছবিটির মূল বিবেচ্য বিষয় হলো মানুষের নৈতিক সংকট। চরম বিপদের মুখে মানুষের স্বার্থপরতা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং কে কাকে রক্ষা করবে—এই চিরন্তন প্রশ্নগুলো ফের উঠে এসেছে।

সিও ইয়ং-চলের চরিত্রের মাধ্যমে নির্মাতা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিপরীতে দলগত নিয়ন্ত্রণের এক অন্ধকার দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, তথ্যের আদান-প্রদানকারী সংক্রমিতরা সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত প্রজাতি। কিন্তু এই দার্শনিক দিকটি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ পুরো ছবিতে খুব একটা পাওয়া যায়নি। অ্যাকশন ও উত্তেজনার চাপে গল্পের গভীরে প্রবেশের চেয়ে বাইরের ঘটনার ওপরই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিনব এই ভাবনা আর রক্তাক্ত অ্যাকশন ছবিটিকে উপভোগ্য করেছে, যদিও গল্প ও চরিত্রের গভীরতায় ঘাটতি রয়ে গেছে।

প্রধান চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান। বিজ্ঞানী কওন সে-জং চরিত্রে জুন জি-হিউন নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করলেও তাঁকে অধিকাংশ সময় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মাধ্যম হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কু কিও-হোয়ান তাঁর অভিনয়ের গুণে মনোযোগ কাড়লেও চরিত্রটির মানসিক বিবর্তনের গভীরতা কিছুটা অস্পষ্টই থেকে যায়। অন্যদিকে, হিউন-সক ও তাঁর বোনের সম্পর্কের মানবিক দিকটি কিছুটা আবেগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

দুই ঘণ্টার বেশি দীর্ঘ এই সিনেমাটি সব সময় সমান উত্তেজনায় ভরপুর থাকে না। কখনো কখনো চরিত্রের সিদ্ধান্তগুলো অযৌক্তিক মনে হতে পারে এবং একই ধরনের বিপদ বারবার ফিরে আসায় গল্পের গতি কিছুটা মন্থর হয়। ‘ট্রেন টু বুসান’-এর মতো প্রতিটি মুহূর্তে তীব্র উত্তেজনা ধরে রাখতে না পারলেও, পরিচিত উপাদানগুলোকে নতুন কৌশলে ব্যবহার করে দর্শককে বিনোদন দেওয়ার কাজটি সফলভাবেই করেছেন ইয়ন সাং-হো। মৃত মানুষের ফিরে আসা, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, চারপাশে আতঙ্ক আর বেঁচে থাকার জন্য মুষ্টিমেয় মানুষের লড়াই—এসব পরিচিত উপাদান দিয়েই বছরের পর বছর তৈরি হয়েছে এন্তার ছবি। সংক্রমিত মানুষ পরিণত হয় বিকৃত শরীরের হিংস্র প্রাণীতে, যাদের কামড় ও দেহনিঃসৃত তরলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ।