
সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ জন আহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান দীর্ঘদিনের সংঘাতকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে গেছে। এটি কেবল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং পুরো অঞ্চলে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের মতো দেশও এখন বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় রয়েছে। হতবিহ্বলজনক এই বিপুল মৃত্যু সেখানে এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
গত এক বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা থেকে বেরিয়ে আসার সহজ কোনো পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। যদিও গাজা বা ইরানে চলমান যুদ্ধের তুলনায় এখানে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন, তবে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো স্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলোতে শান্তির এই ধারাবাহিক ক্ষয় দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রভাবে পর্যটন, জ্বালানি ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো আজ বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক সংঘাত আরও তীব্র হয়ে এক নতুন মোড় নিল।
এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল এক বছর আগে, যখন ইরান তাদের পরমাণু স্থাপনায় মার্কিন হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২০২৫ সালে কাতার ইসরায়েলের সরাসরি হামলার শিকার হয়। হামাস সদস্যদের লক্ষ্য করে চালানো সেই হামলায় পাঁচ ফিলিস্তিনি ও একজন কাতারি নাগরিক নিহত হন। অথচ আগের ঘটনাগুলোর তুলনায় এই হামলায় কোনো সতর্কবার্তা বা পূর্ব-সমন্বয় ছিল না, যা দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিশ্বাস ও নিরাপত্তার ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই ছিল কোনো উপসাগরীয় দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাণঘাতী হামলা।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ইরান নীতি উপসাগরীয় দেশগুলোকে সংঘাতের কেন্দ্রে টেনে আনে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের পেছনে রাজনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে তেহরান একযোগে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমানের ওপর পাল্টা আঘাত হানে। এর ফলে ওই দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি, পানি শোধন কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্কুল, কলেজ ও আকাশসীমা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চলের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকদের জন্য এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তাদের পরিকল্পিত আধুনিক ভাবমূর্তির ওপর। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে খেলাধুলা, বিনোদন ও পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের বিশ্বদরবারে তুলে ধরার যে লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করেছিল, তা এখন সস্তা ড্রোন হামলার কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। এছাড়া ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের ক্ষত নতুন করে সামনে এসেছে। যদিও ২০২২ সালের পর ইয়েমেনে যুদ্ধ কিছুটা থিতিয়ে এসেছিল এবং সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছিল, কিন্তু বর্তমানের এই নতুন শত্রুতা সেই পুরনো সংকটগুলোকে আবার চাঙ্গা করে তুলেছে। সংখ্যালঘু শিয়া অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির রাজধানী সানা দখল করে নিলে ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত একটি জোট হুতিদের উৎখাত করতে এক নির্মম সামরিক অভিযান শুরু করে।
সব মিলিয়ে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এমন এক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে আটকা পড়েছে, যেখানে পুরনো মিত্রতাগুলো আর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। গাজার অমিমাংসিত সংকট, ইসরায়েলের লেবানন অভিযান এবং হুতি বিদ্রোহীদের পুনরুত্থান মিলিয়ে পুরো অঞ্চল এক চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নাসরিন মালিকের বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন এই নতুন ধরনের যুদ্ধ মোকাবিলা করা চরম প্রতিকূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক বছরে উপসাগরীয় অঞ্চল নতুন এক অস্থিরতার যুগে ঢুকে পড়েছে, যা সাময়িক নয় এবং কোনোভাবেই পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।





