১২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চুয়েটের অচলাবস্থা নিরসনে ক্যাম্পাসে ইউজিসির ৬ সদস্যের কমিটি

Published: October 28, 2026, 3:51 pm

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) চলমান অস্থিরতা কাটাতে মাঠে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে ছয় সদস্যের একটি পরামর্শক কমিটি আজ বুধবার সকালে সেখানে পৌঁছেছে। কমিটির সদস্যরা শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করছেন। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রস্তাবনা ও মতামত শোনার পর সংকট উত্তরণের সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেবে এই প্রতিনিধি দল। এ অবস্থায় আজকের মতবিনিময় সভাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দীর্ঘ ৩৬ দিন বন্ধ থাকার পর আজ থেকে চুয়েটে ক্লাস ও পরীক্ষা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার পথে বড় বাধা রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রধান দাবি অর্থাৎ সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষক সমিতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ১৯ অক্টোবর ইউজিসি এই পরামর্শক কমিটি গঠন করে। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এবং সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসান। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিব মাহবুবুল হক পাটোয়ারীও কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আজ সকাল ১০টায় শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন কমিটির সদস্যরা। এরপর পর্যায়ক্রমে সাড়ে ১১টা থেকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে, দুপুর আড়াইটা থেকে কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এসব বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হওয়ার প্রভাব এবং সংকট সমাধানে বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, পরীক্ষা আয়োজন ও সম্ভাব্য সেশনজট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন জানান, সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই তাদের মূল লক্ষ্য। আলোচনা শেষ করে তারা দ্রুত সুপারিশপত্র জমা দেবেন। চুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান জানিয়েছেন, ইউজিসির সঙ্গে আলোচনার পরেই ক্লাস ও পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট তারিখ জানা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন থেকেই শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। নতুন নিয়োগ প্রত্যাহার এবং সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক সমিতি ও কর্মচারীরাও পরবর্তীতে এই আন্দোলনে যোগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিয়মিত শিক্ষা ও ব্যবহারিক কার্যক্রম থমকে যায়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

গত ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিদ্যমান সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যার ধারাবাহিকতায় ইউজিসির এই কমিটি গঠিত হয়েছে। তবে কমিটির গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, কমিটিতে চুয়েটের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যথাযথভাবে উঠে আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের পরিস্থিতি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়া সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে-এমন কাউকে কমিটিতে রাখা হলে সংকটের কারণ চিহ্নিত করা সহজ হতে পারত। তবে এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য কতটা গুরুত্ব পায় এবং ইউজিসির সুপারিশে সংকটের মূল কারণগুলো কীভাবে উঠে আসে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতি।

শিক্ষক সমিতির নেতারাও কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সদস্য না রাখায় আপত্তি তুলেছেন। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফেরার সিদ্ধান্ত হলেও আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো লক্ষণ নেই। প্রশাসনিক সংকট এবং আস্থার ঘাটতি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউজিসির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেয় এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা কত দ্রুত ফেরে, এখন পুরো বিষয়টি সেদিকেই তাকিয়ে আছে।