
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরাশক্তি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নিজের আধিপত্য হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপ অনুযায়ী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি বর্তমানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির চেয়ে এগিয়ে আছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহুর বিদায় কি সত্যিই ইরান, গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী নীতি বদলে দেবে, নাকি নতুন নেতৃত্বেও এই সংঘাত অব্যাহত থাকবে?
নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া সত্ত্বেও গাদি আইজেনকট মোটেও শান্তিবাদী নন। বরং সাবেক এই সেনাপ্রধান হামাসের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নস্যাৎ করা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। তিনি ফিলিস্তিনের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের ধারণারও বিরোধী। ফলে নেতৃত্ব বদলালেও ইসরায়েলের মূল নিরাপত্তানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইরানকে ইসরায়েলের জন্য প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে গণ্য করেন নেতানিয়াহু ও আইজেনকট উভয়েই। আইজেনকট এক্ষেত্রে কূটনৈতিক পথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী। তবে প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্পও তিনি খোলা রাখতে চান। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অবসান সহসা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার ঘটনার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কার্যত প্রতিদিনই তেলআবিব হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ বিদ্যমান। আইজেনকট অবশ্য ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আলোচনার পক্ষপাতী হলেও সামরিক অভিযানের পথ পুরোপুরি পরিহার করতে রাজি নন, যার অর্থ নেতানিয়াহু ক্ষমতা ছাড়লেও স্থায়ী শান্তি অধরাই থেকে যেতে পারে। ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান ও কঠোর নীতির জন্য নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
লেবানন সীমান্তেও পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই। অতীতে লেবানন যুদ্ধে সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করা আইজেনকট হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ধরণ বা তীব্রতায় পরিবর্তন আসলেও সীমান্তের ওপারে নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখার কঠোর নীতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে আইজেনকট কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং বসতি সম্প্রসারণের কিছু উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তবে ফিলিস্তিনের সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থানেই অনড়। জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তার কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথও কঠিন।
নেতানিয়াহুর বিদায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক চাকরির বাধ্যবাধকতা প্রবর্তনের মতো ইস্যুগুলো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। এছাড়া কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের প্রভাব হ্রাস এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ১২০ আসনের নেসেটে এককভাবে সরকার গঠন করা যে কোনো দলের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। আইজেনকটের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে জোটে অনীহা সরকার গঠনের পথটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বা গাজায় কঠোর নিরাপত্তানীতি নিয়ে একধরনের ঐকমত্য রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলেও সংঘাতের মূল কারণগুলো থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তবে ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করা কোনো পক্ষের জন্যই সহজ নয়।





