১৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রবাসী আয় ও রিজার্ভের উল্লম্ফনে শক্তিশালী বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত

Published: September 28, 2026, 1:08 pm

প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি এবং সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত বেশ শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে ৬৬১ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৩৯ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বাণিজ্য ও চলতি হিসাবে কিছু ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে প্রায় ৭৯০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ইতিবাচক রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩৯ কোটি ডলার।

প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি। গত আগস্ট মাসে প্রবাসীরা প্রায় ২৯৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের ২৪২ কোটি ডলারের চেয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টে মোট ৫৮৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল। জুলাইয়ের ২৮৬ কোটি ডলারের তুলনায় আগস্টে আয় বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের আস্থা বাড়াচ্ছে। সরকারি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রবাহ সহজ ও আকর্ষণীয় করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে ১ হাজার ৮৯৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ডলারের তুলনায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আস্থারও প্রতিফলন ঘটছে এতে।

প্রবাসী আয় বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। আগস্ট মাস শেষে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ডলারে, যা জুলাই মাস শেষে ছিল ৩ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার। এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে এই রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ১১৭ কোটি ডলার। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী আগস্ট শেষে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই পদ্ধতিতে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৬২৭ কোটি ডলার। আগস্ট শেষে এ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার, জুলাই শেষে যা ছিল ৩ হাজার ১৫৮ কোটি ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ১৭ পয়সা, যেখানে আগস্ট শেষে তা ছিল ১২৩ টাকা ২১ পয়সা। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনাসহ আন্তব্যাংক লেনদেন সহজ করতে গত আগস্টে ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট বা এফএক্সএম মডিউলের সরাসরি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের সুবিধা বৃদ্ধিও বাজারের তারল্য বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।

বৈদেশিক খাতের উন্নতির পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমেও গতি ফিরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিশেষ করে শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া মনে করেন, আমদানির এই ধরন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। বৈদেশিক খাতের উন্নত অবস্থান আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক দায় পরিশোধে বাড়তি সক্ষমতা দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেন, প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বাড়ায় ব্যাংকগুলোর ওপর আমদানি ব্যয় মেটানোর চাপ অনেকটাই কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে তা উৎপাদনশীলতায় অবদান রাখে। এই ধারা অব্যাহত রাখতে স্থিতিশীল বিনিময় হার বজায় রাখা, রেমিট্যান্স সেবা সহজ করা এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।