২৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের আমেজ

Published: October 8, 2026, 3:48 pm

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র এখন শারদীয় উৎসবের আমেজ। শরতের আগমনের সাথে সাথে নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলোতে দুর্গাপূজার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি অঞ্চলে পূজার আয়োজনের ব্যাপ্তি ও জাঁকজমক বিশেষ নজর কেড়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের তথ্যানুযায়ী, কেবল এই অঞ্চলেই দুই ডজনেরও বেশি স্থানে দুর্গাপূজা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। ফলে অক্টোবরজুড়ে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলো কার্যত একেকটি ছোট বাংলায় পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের সামনে দেবী দুর্গার আরাধনা, বাংলা সংগীত, নৃত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে আয়োজিত উৎসবটি প্রবাসী বাঙালিদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ১০ ও ১১ অক্টোবর ফাদার ডাফি স্কয়ারে পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে গীতাপাঠ, ধুনুচি নাচ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা রাখা হয়েছে। এবারের টাইমস স্কয়ার আয়োজনের সাথে মহালয়ার বিশেষ সংযোগ রয়েছে, যদিও মূল পূজা ও মহালয়ার সময়সূচিতে ভিন্নতা থাকায় আয়োজকরা ১০ ও ১১ অক্টোবরেই তাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি সম্পন্ন করবেন। আয়োজকদের প্রকাশিত সূচিতে ১০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজা থেকে শুরু করে সপ্তমী ও অষ্টমীর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার কথা রয়েছে।

নিউইয়র্কে দুর্গোৎসবের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে সেই ছোট পরিসরের পূজা আজ টাইমস স্কয়ারের মতো আন্তর্জাতিক জনপরিসরে পৌঁছেছে, যা প্রবাসী বাঙালি সমাজের অগ্রগতিরই প্রতীক। ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, তাদের আয়োজনে প্রতিবছর এক হাজারের অধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পূজা সমিতি অব নিউইয়র্ক ১৯৯০ সালে তাদের পথচলা শুরু করে এবং এবছর তারা ৩৭তম দুর্গাপূজার আয়োজন করছে। তাদের পূজা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর। কোথাও কয়েক দশকের পুরোনো সংগঠনের ঐতিহ্যবাহী পূজা, কোথাও আবার নতুন প্রজন্মের উদ্যোগে গড়ে উঠছে নতুন আয়োজন। টাইমস স্কয়ারের আয়োজনটির একটি বিশেষ দিক হলো—এটি প্রচলিত বাঙালি কমিউনিটি হলের বাইরে নিউইয়র্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান জনপরিসরে দুর্গাপূজাকে নিয়ে এসেছে। নিউইয়র্কে দীর্ঘ ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু এর শিকড় বেশ গভীরে। তখন নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকশ।

নিউজার্সি অঞ্চলের উৎসবও বেশ ঐতিহ্যের দাবিদার। জার্সি সিটির গার্ডেন স্টেট পূজা কমিটি এবছর তাদের ৪৫তম দুর্গোৎসব আয়োজন করছে। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যেও উৎসবের আমেজ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। টেক্সাসে রিদম কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর ফার্মার্স ব্রাঞ্চে তাদের পূজা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এছাড়া সোইকটের ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, বাঙালি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনা তাদের উৎসব সাজিয়েছে ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর।

ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গাপূজা এখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ার পর এর আবেদন বিশ্বজুড়ে আরও বেড়েছে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি বা বোস্টনের মতো ঐতিহ্যবাহী বাঙালি কেন্দ্র ছাড়িয়ে এখন আমেরিকার দূরবর্তী রাজ্যগুলোতেও দুর্গোৎসবের ব্যাপকতা স্পষ্ট। এই আয়োজক সংগঠনগুলো ও অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহই প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও শিকড়ের টানে প্রবাসে বাঙালিরা কীভাবে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখছেন।