
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়ে তেহরানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে মস্কো। তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, ইরান যে যুদ্ধের অবসান কামনা করছে, সেই সংঘাত থেকেই কার্যত রাশিয়ার রাজস্ব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, রুশ তেলের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ—সব মিলিয়ে তেহরান সংকট থেকে রাশিয়া কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করছে। রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধে ওয়াশিংটনের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে মস্কো। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতির মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যা রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে রাশিয়া।
সোমবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। বৈঠকের পর মঙ্গলবার আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই ইরান ও রাশিয়া এখনকার মতো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেনি। মূলত যুদ্ধকালীন এই অংশীদারত্ব আরও মজবুত করা এবং সংঘাত-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোই লাভরভের এই সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, দুই দেশই যখন নিজ নিজ যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে, তখন লাভরভের প্রধান লক্ষ্য হলো রাশিয়া-ইরান জোটকে আরও সুসংহত করা। রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিতে চায়। তবে হাশেমির মতে, এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে নতুন কাঠামো গড়ে উঠলে সেখানে নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করতে চায় মস্কো।
রাশিয়া ও ইরানের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হলেও দুই দেশের চুক্তিতে পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ২০ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন, যা একই বছরের অক্টোবরে কার্যকর হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর এই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোনের প্রযুক্তির পাশাপাশি ২০২৪ সালে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে।
তেহরান সফরের সময় লাভরভ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রুশ বিশেষজ্ঞরা পর্যায়ক্রমে ফিরে আসবেন। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলো গত রোববার বাহরাইনে এক সংলাপে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরানের ওপর প্রভাব খাটানোর আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়ার কাছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রকাশ্যে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করলেও মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে স্যাটেলাইট চিত্র এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে সহায়তা করছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। হরমুজ প্রণালিতে ইরান কার্যত জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০ অক্টোবর ছিল ১০৯ ডলারের ওপরে।
তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিকল্প উৎস হিসেবে রুশ জ্বালানির চাহিদাও বেড়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল নাগাদ রাশিয়ার তেল কর থেকে আয় দ্বিগুণ হয়ে ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপে যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেলের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। গত মার্চ থেকে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সমুদ্রপথে আগে থেকেই বোঝাই করা রুশ তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে আসছে এবং রাশিয়ার ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার ছাড় ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়া এবং দেশটির তেল-গ্যাসের ক্রেতাদের ওপর নতুন করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার টেবিল থেকে রাশিয়াকে সরিয়ে দিতে চান না বলেই ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক জন লফের মতে, ক্রেমলিন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ মেলানোর সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করতে মস্কো সফল হয়েছে। এতে তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির নিষেধাজ্ঞা সমর্থনকারী সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিনের মতে, ইরান যুদ্ধ থেকে রাশিয়া সাময়িক অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও মস্কো হয়তো সংঘাতের বিস্তার চায় না। তবে সংঘাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই সুবিধা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
কারণ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা রাশিয়ার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে রাশিয়া একটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন নাদের হাশেমি। গত ৯ অক্টোবর পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে সংঘাতের অবসান নিয়ে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেছেন। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই বাহিনীর সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্পের ইরান নীতিতে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে ইরান যুদ্ধের সমাধানে পুতিনের সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ কতটুকু, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এছাড়া গত মাসে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য নভেম্বরে চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন, ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের বৈঠক হলে তাতে ইরান সংকটও আলোচনার টেবিলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া অক্টোবরের শেষ দিকে মস্কোয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অংশ নেবেন বলে আশা করছে রাশিয়া।





