১০ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সৌদি যুবরাজ

Published: October 13, 2026, 8:57 pm

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদের মধ্যে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি সুরক্ষাদল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট এ তথ্য জানিয়েছে।

চলতি সপ্তাহেই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। শনিবারের ওই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। বিমানবন্দরে অবস্থিত একটি টার্মিনাল ধসে পড়ার পাশাপাশি টার্মিনাল ৪-এ বড় ধরনের আগুন ধরে যায়। এ সময় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালার মৃত্যু হয়; হামলায় তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি মারা যান বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হামলায় বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়ে। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও ছিলেন।

রোববারও বিমানবন্দর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার রেশ ছিল, যা রাজধানীর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে যুদ্ধকালীন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত শহরবাসী নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করছেন। শুধু সাধারণ নাগরিকই নয়, রিয়াদের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক স্কুল এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদেরও ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার আকাশে প্রতিহত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্র কমপ্লেক্সে আছড়ে পড়লে বেসামরিক স্থাপনার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুবরাজের সর্বশেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল মঙ্গলবার। এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হলেও বেসামরিক স্থাপনা যে ঝুঁকিমুক্ত নয়, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সৌদি কর্মকর্তাদের মতে, দেশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। এ কারণেই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও রাজপ্রাসাদ রক্ষায় নতুন করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ অবস্থায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পর্যটন ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি যে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন, বর্তমান অস্থিতিশীলতায় সেসব মেগা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সেদিন তিনি একটি জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রক্তদান করেন।

এরই মধ্যে হুতিরা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও আঘাত করেছে, যা দেশটির লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের আওতায় নিতে হয়েছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর প্রকল্প এবং রিয়াদে একাধিক বড় উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চাপের মুখে রয়েছে রিয়াদ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরামর্শ মিললেও ইয়েমেনে হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতির নতুন মোড় নির্দেশ করছে। হুতিদের কর্মকাণ্ডকে ‘খুবই খারাপ’ উল্লেখ করে ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ চলছে এবং ভবিষ্যতে সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এই নিরাপত্তা সংকট নিরসনে রিয়াদ পাকিস্তানের সহায়তা চেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জরুরি ভিত্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে, কূটনৈতিক পথ ধরে সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে দেশটি। অক্টোবরের শেষের দিকে একটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও হামলার ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব ও আন্তর্জাতিক যাতায়াত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, হুতিদের এই ধারাবাহিক হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচি এবং জাতীয় নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।