১৫ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুমায়ুন কবির: প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব জোরদার হয়েছে

Published: October 30, 2026, 11:50 pm

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি জাপান সফরে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে টোকিও। গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই সফরের সফল ফলাফল ও বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে আজ শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, দুই দেশের সম্পর্ক এখন কেবল উন্নয়ন সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন এক সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের ভাষ্যমতে, এই সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্বকে একটি পারস্পরিক কল্যাণকর অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সম্পর্কের কাঠামোতে রূপান্তরের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সফরটি অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই উদ্যোগ সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতিরই একটি প্রতিফলন, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। যার সঙ্গেই আমরা ব্যবসা করব, প্রকৃত পারস্পরিক বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই তা করব। অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করে আঞ্চলিক কোনো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে আলোচনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা এই সফরের অন্যতম একটি বড় অর্জন। এই বিনিয়োগের ফলে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন যে, এটি কোনো সরকারি ঋণের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বেসরকারি খাতের বিশাল সম্ভাবনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পারস্পরিক পরামর্শের জন্য শিগগিরই জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সতর্ক। প্রতিমন্ত্রী জানান, জাতীয় অগ্রাধিকার, সাশ্রয়ী ব্যয়, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা বিবেচনা করে প্রতিটি প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার কেবল এমন বিনিয়োগকেই স্বাগত জানাবে যা ব্যয়ের তুলনায় যথাযথ সুফল বয়ে আনবে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পস্থাপনা এবং আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জাপান জানিয়েছে।

সফরের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালু করা, ঢাকার মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় জাপানের কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করতে জাপানের ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

জাইকা প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন এবং সহজ শর্তে অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

প্রতিমন্ত্রী জানান, জাপান সফরের সময় অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে মোট ছয়টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়াও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে জাপানের অব্যাহত সম্পৃক্ততা ও সমর্থন প্রত্যাশা করেছে বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরের সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ফুৎসুতে জেরা (JERA) এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, এটি মূলত বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো পরিকল্পনার জন্য কারিগরি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল; এর সঙ্গে জাপান থেকে সরাসরি এলএনজি আমদানির কোনো আলোচনার সম্পর্ক নেই। এছাড়া ২৯ অক্টোবর নাগোয়া শহরে টয়োটার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশে গাড়ি ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিল্প আধুনিকায়নে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি, মিতসুবিশি ও টয়োটা সুশোর মতো শীর্ষস্থানীয় জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৈরি পোশাকশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর। এসব ব্যবসায়িক আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপেও অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সেখানে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের বিশাল বিনিয়োগ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে দেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন যে, সরকার ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, লাইসেন্স প্রদান এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তিনি পরিষ্কার করে বলেন, আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং এখানে কোনো তৃতীয় দেশ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের স্বাধীনতা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়েও ফলপ্রসূ মতবিনিময় হয়েছে।