২০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নূহের নৌকার সন্ধানে তুরস্কে নতুন করে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান

Published: October 2, 2026, 11:05 am

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকার দুরুপিনার ফরমেশনে ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক গবেষণা শুরু হয়েছে। নৌকার আকৃতির বিশালাকার এই মাটির ঢিবির রহস্য উন্মোচনে বর্তমানে রাডার স্ক্যান, কোর ড্রিলিং এবং মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সসহ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল। নতুন অনুসন্ধানে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণও করা হচ্ছে।

এই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিচিতি ও আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনা বাড়াতে তুরস্কের ফিল্ম কমিশনও প্রকল্পটি নিয়ে বেশ আশাবাদী। কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি জানান, আন্তর্জাতিক মানের তথ্যচিত্র তৈরির উদ্যোগ অঞ্চলটিকে নতুন করে পরিচিতি দেবে। ভৌগোলিকভাবে দুরুপিনার ফরমেশনটি আরারাত পর্বতের কাছে তেলচেক গ্রামের সীমান্তে অবস্থিত। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণের সময় প্রথম এই অস্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক গঠনটি শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই এটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে।

গবেষকদের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, জিপিএস ডেটা ব্যবহার করে স্থানটির দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে রাডার জরিপের মাধ্যমে মাটির নিচে বেশ কিছু ফাঁকা কাঠামোর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা দেখতে করিডোর বা কক্ষের মতো। এই স্থানগুলোতে এখন ড্রিলিং চলছে। আগামী দিনে এসব ভূগর্ভস্থ অংশে ‘গোফার’ নামের একটি বিশেষ রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। রোবটটি উচ্চ রেজল্যুশনের ভিডিও ধারণের পাশাপাশি মাটির নমুনা সংগ্রহের সক্ষমতা রাখবে বলে জানানো হয়। অধ্যাপক আতিলার ভাষ্য, রাডার জরিপে মাটির নিচে কয়েকটি ফাঁকা জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণে গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পেয়েছেন। তিনি জানান, ঢিবির ভেতরের ও বাইরের মাটির মধ্যে জৈব পদার্থ এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য দৃশ্যমান। ভেতরের মাটিতে বাইরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি জৈব পদার্থ বিদ্যমান। এছাড়া পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রায় প্রায় আটগুণ পার্থক্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময়ের বদ্ধ পরিবেশে কোনো পদার্থের ক্ষয়িষ্ণু প্রক্রিয়ার সঙ্গে এসব পরিবর্তন সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, তবে এটি নূহের নৌকার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদুলু ও ডেইলি সাবাহর প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তাই চলমান কাজের একটি অংশ আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে।

দুরুপিনার ফরমেশনকে নূহের নৌকার অংশ দাবি করার ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও এর কোনো বৈজ্ঞানিক সুরাহা এখনো হয়নি। ১৯৯৬ সালের এক গবেষণায় এটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের একাংশ মনে করেন, চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির সমন্বয়ে গঠিত এই কাঠামোটি প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার ফলেই নৌকার আকৃতি ধারণ করেছে। অতীতে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ডও এখানে গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার ব্যবহার করেছিলেন। সেই সময় ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য ১৬৪ মিটার পরিমাপ করা হয়েছিল, যা বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত নূহের নৌকার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি। সে সময় আবিষ্কৃত কিছু পাথরকে অনেকে জাহাজের নোঙর বলে দাবি করলেও সংশয়বাদীরা সেগুলোকে সমাধিফলক বলে মনে করেন। পরবর্তীতে ফ্যাসোল্ড নিজেও নিজের পুরনো তত্ত্ব থেকে সরে এসেছিলেন। ৩৪০০০ ফুট উঁচুতে এক পাইলট ছুরিকাঘাত করেন আরেকজনকে, ১৮০ যাত্রীসহ বিমান ক্র্যাশ করার চেষ্টা। ফরমেশনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৪ মিটার বলে মাপা হয়েছিল, যা ধর্মীয় বর্ণনায়র্থকদের মধ্যে নানা দাবি রয়েছে।

অধ্যাপক জানকার আতিলা জানিয়েছেন, শীতের তীব্রতার কারণে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় কিছুটা বিরতি আসতে পারে। সংগৃহীত নমুনাগুলো শীতকালজুড়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হবে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফল পাওয়ার আশা করছেন তারা। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আগামী বছরগুলোতেও চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম—তিনটি ধর্মের কাছেই নূহের নৌকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যদি কোনোভাবে এর অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়, তবে স্থানটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ধর্মীয় ও পর্যটন আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে। তবে বর্তমানে এই অনুসন্ধান কেবল গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।