
নড়াইল জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জনকারী কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। ‘স্বপ্ন দেখো, জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশের ৬৪টি জেলায় চলমান এই কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখো। বুধবার সকালে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির সূচনা হয়। বুধবার নড়াইলে শিখো– জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসেছিল সে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাসকে ঘিরে। দিনমজুর নিত্য গোপাল বিশ্বাস ও গৃহিণী দীপ্তি বিশ্বাসের মেয়ে পূজা নলদীরচর এলাকার বাসিন্দা। আর্থিক অভাব ও জরাজীর্ণ ঘরের প্রতিকূলতাকে জয় করে সে স্থানীয় কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার এই অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের গল্প এদিন সবার নজর কেড়েছে। আজ সেখানকার একজন শিক্ষার্থী এখানে এসেছে, কথা বলেছে। অনেকে ভাবেন, শিল্পচর্চা মানুষকে পড়ালেখা থেকে দূরে নিয়ে যায়।
পূজার জন্য বিশেষ চমক নিয়ে এসেছিলেন শিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য ধর্মদাস মল্লিক। পূজা একসময় ধর্মদাস মল্লিকের অবৈতনিক ‘চারুকুঠি শিল্পালয়ে’ ছবি আঁকা শিখত। অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই তিনি পূজার জন্য নিজের হাতে আঁকা একটি ছবি নিয়ে এসেছিলেন, যা তিনি মঞ্চেই উপহার দেন। ধর্মদাস মল্লিক বলেন, শহর ছেড়ে গ্রামে অবৈতনিক স্কুল করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আজ পূজা ও তার মতো শিক্ষার্থীদের সাফল্যে তিনি নিজেকে সার্থক মনে করছেন। তিনি আরও জানান, পূজা তার প্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকা ও আত্মোন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং তার মেলাগুলোতে পণ্য বিক্রিতেও সহায়তা করেছে। পূজা আসবে জেনে তিনি নিজের কাঁধ ব্যাগে করে তার জন্য একটি ছবি নিয়ে আসেন।
অনুষ্ঠানে নিজের স্বপ্ন নিয়ে পূজা বিশ্বাস জানায়, সে ভবিষ্যতে একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে গরিব মানুষের সেবা করতে চায়। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার এই স্বপ্ন পূরণের পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সে লড়াই চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। অর্থাভাবে পড়াশোনা আটকে যেতে বসেছিল।
উপবার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, সাফল্যের এই স্বীকৃতি যেন কারো মনে অহংকারের জন্ম না দেয়। তিনি মা-বাবা, শৈশবের শিক্ষক এবং জিপিএ-৫ না পাওয়া বন্ধুদের কথা স্মরণ রাখার পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের বড় হওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেন। নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ও পটশিল্পী নিখিল চন্দ্র দাস বলেন, এসএসসি মাত্র সাফল্যের শুরু। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে প্রচুর ধৈর্য ও কষ্টের প্রয়োজন। তিনি কৃতী শিক্ষার্থীদের বড় হয়ে ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার আহ্বান জানান। কাজী আলিম-উজ-জামান বলেন, ‘জিপিএ-৫ পাওয়ায় তোমাদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের অহংকারবোধের জন্ম না দেয়। কিন্তু শৈশবের শিক্ষাগুরু, মা–বাবা, এমনকি যে বন্ধুটি আজ জিপিএ-৫ পায়নি, তাকে ভুলে যেও না।’।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা মো. মহিউদ্দিন। এসময় বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান ও শিক্ষক মাহবুবর রশীদ বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্যে নড়াইল প্রতিনিধি রাজু শেখ সম্পাদক মতিউর রহমানের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। আয়োজনের বিভিন্ন পর্বে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে এবং গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে। স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় গান ও নৃত্যও অনুষ্ঠিত হয়।
এ আয়োজনে পাওয়ার্ড বাই পার্টনার হিসেবে ছিল বিকাশ। এছাড়া সহযোগিতায় ছিল কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও বন্ধুসভা।





