
প্রাবন্ধিকের পরিচিতি
- লেখক: শশী থারুর (ভারতের লোকসভার বিরোধী দলের সংসদ সদস্য)
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
- অনুবাদক: সারফুদ্দিন আহমেদ
কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া এক বিশেষ সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বৃত্তে বন্দি ছিল। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ছোটখাটো সামরিক উত্তেজনার পর পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি এবং পরবর্তীতে আবারও নতুন কোনো সংঘাতের সূচনা—এটাই ছিল দীর্ঘদিনের চিরাচরিত চিত্র। তবে বর্তমানে সেই পুরোনো কূটনৈতিক রূপরেখা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। এটি কেবল সাময়িক কূটনৈতিক বিবাদ নয়, বরং ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির একটি স্থায়ী পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ, যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া একধরনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের চক্রে আটকে ছিল। এরপর উত্তেজনা কমলে নতুন করে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হতো। পরবর্তী সময়ে সেই আলোচনা আবার আরেক সংঘাতের মধ্য দিয়ে ভেঙে পড়ত। এটি সাময়িক কোনো কূটনৈতিক ক্ষোভ নয়; বরং এটি ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির এক স্থায়ী পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামো চিরতরে বদলে গেছে।
বর্তমান অচলাবস্থার মূলে রয়েছে অতীতের কূটনীতির মৌলিক ব্যর্থতা। পাকিস্তান ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছিল, কিন্তু কোনোটি থেকেই তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আশির দশকের শেষভাগে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন-সমর্থিত মুজাহিদিনদের সাফল্য থেকে উৎসাহিত হয়ে দেশটির সামরিক বাহিনী ছায়াযুদ্ধ বা সন্ত্রাসবাদকে যুদ্ধের নতুন কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে ভারতে পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলায় অসংখ্য সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। তবুও ভারতীয় নেতৃত্ব একটি আশা পোষণ করতেন যে, আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানকে এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেই উদ্দেশ্য থেকেই নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে কাশ্মীর সমস্যা, বাণিজ্য এবং মানবিক বিষয়গুলোকে আলাদা রেখে আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। এই অভিজ্ঞতা এবং ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন–সমর্থিত মুজাহিদিনদের সাফল্য থেকে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করে। সেই বিশ্বাস থেকেই ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে যৌথ আলোচনার কাঠামো তৈরি করা হয়।
তবে ভারতের প্রতিটি গঠনমূলক পদক্ষেপের বিপরীতে পাকিস্তান প্রায়ই সামরিক আক্রমণ বা হামলার আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৯৯ সালে অটল বিহারি বাজপেয়ীর ঐতিহাসিক লাহোর সফর ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই পাকিস্তানি বাহিনীর কার্গিল অনুপ্রবেশের ঘটনা সেই আস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে গোপনে কাশ্মীরের সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছালেও মুম্বাই হামলার মতো ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করে দেয়। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ভারতের সাথে শান্তি স্থাপনকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে এবং দেশটির বেসামরিক সরকারের কার্যত কোনো স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেই।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার শুরুতে পুরোনো ধারার কূটনীতিই বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। ২০১৪ সালে শপ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানানো কিংবা ২০১৫ সালে লাহোর সফর—সবই ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। এমনকি পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলার পরও ভারত পাকিস্তানকে তদন্তে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু পাকিস্তানের তদন্ত দলের নাটকীয় দাবি ভারতকে তাদের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত সংযম’ নীতি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এখন ভারতের নতুন নীতি হলো—সন্ত্রাস ও আলোচনা একই সঙ্গে চলতে পারে না; পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাস নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ নির্মূল করলেই কেবল সংলাপ সম্ভব। যাতে একটি বিষয়ের বিরোধ অন্য বিষয়ের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে।
সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলেছে। গত তিন দশক ধরে পাকিস্তান মনে করত, তাদের ছোট পারমাণবিক অস্ত্র ভারতকে প্রথাগত সামরিক জবাব দেওয়া থেকে বিরত রাখবে। কিন্তু ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো ঘটনায় ভারত সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এখন ভারত সীমান্ত পেরিয়ে হামলা কিংবা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার মাধ্যমে পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে যে, রাষ্ট্রীয় মদদে সন্ত্রাস চালালে তার চড়া মাশুল দিতে হবে।
এই অচলাবস্থা পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম না থাকা উদ্বেগের কারণ। বর্তমানে বাণিজ্য, পানি বণ্টন কিংবা মানবিক ইস্যুগুলোকেও জাতীয় নিরাপত্তার চশমায় দেখা হচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে আলোচনার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, কারণ পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব এখনো ভারতের প্রতি শত্রুতাকে ক্ষমতার উৎস মনে করে, যদিও দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। অন্যদিকে, শক্তিশালী অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতার কারণে ভারতও এখন নিরাপত্তা প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিও এই অঞ্চলে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল থেকে সরে এসে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা এবং পাকিস্তানের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও তারা বিভিন্ন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সাথে লাভজনক চুক্তি স্বাক্ষর এবং মার্কিন প্রশাসনের মনোযোগ পেতে সমর্থ হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব এখন এতই গভীরে শিকড় গেড়েছে যে, এটিকে সাময়িক বিরতি না বলে বরং ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে থাকার কৌশল বলাই শ্রেয়।





