৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইলিশ কমছে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি

Published: September 24, 2026, 5:25 pm

১৮ সেপ্টেম্বর মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, ভারত থেকে আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্তের পর জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ইলিশ আমদানি বন্ধ হলে কি দেশের ইলিশের সংকট মিটবে? আসলে প্রশ্নটি আরও গভীর। এর অন্তরালে যে মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, তা হলো—বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের বিচরণ ও প্রাপ্তি কমছে কেন?

দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান ১২ থেকে ১৩ শতাংশ এবং জাতীয় জিডিপিতে এর অংশ প্রায় ১ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, প্রায় ৫ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর বাইরে পরিবহন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ। সুতরাং ইলিশ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক বড় চালিকা শক্তি। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ এই দুই বছরের ব্যবধানে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৭ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ।

ইলিশ উৎপাদন হ্রাসের বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত কারণ

  • শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবিবের মতে, নদী ও সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে কেবল জেলের জালে কী পরিমাণ মাছ উঠছে তা দেখলে চলবে না। নদী, মোহনা, প্রজননক্ষেত্র ও প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথের ওপর নজর দেওয়া জরুরি।
  • ইলিশ-গবেষক ড. আনিসুর রহমান মনে করেন, জাটকা বা ছোট ইলিশকে বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত সুযোগ না দিলে বড় মাছ পাওয়া অসম্ভব। এছাড়া উজানের নদীগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে প্রজননপ্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
  • নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রের আশপাশে পানিদূষণ, অবৈধ জালের ব্যবহার, ডুবোচর সৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের প্রভাব ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
  • খাদ্যাভ্যাসের প্রধান উপাদান প্লাঙ্কটনের রূপান্তর এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে প্রজাতিটির প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথ বদলে যাচ্ছে কি না, তা দ্রুত বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
  • সমুদ্রসীমায় ইলিশের ওপর অতি আহরণের চাপ একটি বড় উদ্বেগের কারণ। সমুদ্র থেকে পরিণত ও ডিমওয়ালা ইলিশ অতিরিক্ত আহরিত হলে নদীতে পর্যাপ্ত মাছ প্রবেশ করতে পারে না।
  • সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা গেছে, তুলনামূলক ছোট আকারের ইলিশে ডিম আসার প্রবণতা বাড়ছে, যা বংশ রক্ষার্থে প্রজাতিটির এক ধরনের বিবর্তন হতে পারে। তবে এর ফলে ইলিশের সার্বিক প্রজননক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়াও, ভারতের গুজরাটের ইলিশ ও আমাদের ইলিশের মধ্যে বয়সভিত্তিক বিন্যাস, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত অভিযোজন নিয়ে তুলনামূলক গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গবেষকদের উদ্ভাবিত ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং’ মাৎস্যবিজ্ঞানের জন্য একটি বড় সাফল্য। আমাদের নদীগুলোতে পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার কারণে ইলিশ বিকল্প প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ভারত বা মিয়ানমারের নদ-নদীতে চলে যাচ্ছে কি না, সেই সম্ভাবনাকেও আধুনিক গবেষণার আওতায় আনতে হবে। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশ নিয়ে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছে। যেহেতু ইলিশ ভৌগোলিক সীমান্ত মানে না, তাই ত্রিদেশীয় গবেষণার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ‘আঞ্চলিক মৎস্য কূটনীতি’ জোরদার করা প্রয়োজন।

পরিশেষে, ইলিশ নিয়ে আলোচনা কেবল আমদানি বন্ধ বা চালুর বিতর্ক নয়, বরং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই আহরণনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়েই কেবল এই জাতীয় সম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। মন্তব্য করেছেন মো. বশিরুল ইসলাম, কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।