৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার সংকট ও টার্মিনাল সরানোর যৌক্তিকতা নিয়ে

Published: October 22, 2026, 3:06 pm

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা, নিত্যদিনের যানজট এবং সড়ক দুর্ঘটনাকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ২০১৮ সালের আলোচিত কিশোর আন্দোলনের আট বছর পার হয়ে গেলেও গণপরিবহন খাতের মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়নি। যদিও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কোম্পানিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে এই নৈরাজ্য দূর করার পথটি সবার জানা, তবুও বাস্তবে সঠিক পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০১৮ সালে দেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া কিশোর আন্দোলনের পর আট বছর পেরিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক হোক আর মানবসৃষ্ট হোক যে কোনো সংকট, দুর্যোগ বিরাট অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে।

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু পুরোনো বাস নতুন করে রং করে সীমিত কিছু রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হয়েছিল। ফলস্বরূপ যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত বাস মেলেনি। গণপরিবহনের এই অব্যവസ്ഥা কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করে বলেই এ খাত দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন থেকে গেছে। যেকোনো বিপর্যয়কে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার যে প্রবণতা, সেটি বাংলাদেশর অবকাঠামো খাতেও দৃশ্যমান।

অতীতের বিদ্যুৎ সংকটের সময় স্বল্পমেয়াদে নেওয়া ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিতে পরিণত হয়েছিল। একইভাবে পরিবহন খাতের স্থায়ী ভোগান্তি নিরসনের নামে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, উড়ালসড়ক এবং বাস র‍্যাপিড ট্রানজিটের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে বাস্তবচিত্র বলছে, ঢাকার সড়কে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি কমার পেছনে এসব অপরিকল্পিত অবকাঠামোরও ভূমিকা রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকায় মেগা প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনটি নতুন মেট্রোরেল লাইন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার সার্বিক প্রাক্কলিত ব্যয় রাখা হয়েছে ৫ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা। পাশাপাশি ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলসেতু প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো এবং বিমান বহরে বোয়িং ও এয়ারবাস যুক্ত করার মতো বড় বাজেটের সিদ্ধান্তও নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী নানা অর্থনৈতিক সংকট ও দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে এত বিপুল অঙ্কের ঋণের দায় দেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের চলমান অর্থনীতিতে যেখানে বাজেট বক্তৃতায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, সেখানে এ ধরনের বড় বাজেটের প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারণের বৈপরীত্যকেই তুলে ধরে। মেট্রোরেল নগরবাসীর এক অংশের জন্য আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে কম খরচে বাসভিত্তিক সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাই ঢাকার অধিকাংশ মানুষের জন্য বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর সমাধান হতে পারত।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, যেখানে পাঁচ-ছয় লাখ কোটি টাকা মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করে মেট্রোরেলের মাধ্যমে মাত্র ১৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব, সেখানে মাত্র পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাস ব্যবস্থার সংস্কারে বিনিয়োগ করা হলে অন্তত ৪০ শতাংশ যাত্রী সুবিধা পেতে পারেন। ফলে অর্থনৈতিক রিটার্নের বিচারে বাস সার্ভিসের আধুনিকায়নই বেশি লাভজনক। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, আমরা যদি পাঁচ-ছয় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে শেষ পর্যন্ত মেট্রোর মাধ্যমে ১৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করি, আর পাঁচ হাজার কোটি টাকা বি। যাত্রীরা অপেক্ষা করেছেন, বাস আসেনি। কানাডীয় রাজনীতি ও অর্থনীতি-বিশ্লেষক নওমি ক্লেইন যেটাকে ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম বলে ব্যাখ্যা করেছেন।

অন্যদিকে ঢাকায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে আনুমানিক ২৫ লাখ অটোরিকশা হঠাৎ বন্ধ করার সুযোগ নেই, তবে এগুলোকে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ছেড়ে দেওয়াও যুক্তিযুক্ত নয়। সম্প্রতি ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানিভিত্তিক বাস ব্যবস্থা চালু করার যে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে তা ইতিবাচক। কিন্তু পুরোনো বাসে শুধু রং বদলে রাস্তায় নামালে এ মডেল আবার ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কারিগরি সমাধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া পরিবহন খাতের সংস্কার কঠিন। বরং বলা ভালো, এটাকে ভেতর থেকে ব্যর্থ করে দেওয়ার সব আয়োজনই করা হয়। গণপরিবহনব্যবস্থায় নৈরাজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি বহাল তবিয়তে টিকে থাকে, তার কারণ এই ব্যবস্থা যত টিকে থাকবে কিছু মানুষের, কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থ ততই পুষ্ট হবে।

যানজট নিরসনে মহাখালী, সায়েদাবাদ বা গুলিস্তানের মতো টার্মিনালগুলোকে কাঁচপুর, কেরানীগঞ্জ কিংবা পূর্বাচলে শহরের সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভোগান্তি বাড়াতে পারে। শহরের অনেক দূরে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে ঢাকায় আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে একই যাত্রায় দুইবার দীর্ঘ ভ্রমণের ঝামেলার মুখোমুখি হতে হবে। তাছাড়া গভীর রাতে যাতায়াতের সময় যাত্রী নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস টার্মিনাল যতটা সম্ভব শহরের কাছাকাছি থাকা উচিত, কারণ গণপরিবহন কখনোই ব্যক্তিগত গাড়ির মতো ডোর-টু-ডোর সেবা দিতে পারে না। মূল সমস্যা টার্মিনালগুলোর অবস্থানে নয়, বরং সেগুলোকে বাস ডিপো বানিয়ে ফেলার অভ্যাসের মধ্যে। ডিপো থেকে বাস নির্দিষ্ট সময়ে টার্মিনালে আসবে, যাত্রী তুলে গন্তব্যে চলে যাবে—এমন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বর্তমান টার্মিনালগুলো থেকেই সুফল পাওয়া সম্ভব।