৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজার সফল আয়োজন ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

Published: October 23, 2026, 7:56 pm

চলতি বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল প্রথম দুর্গাপূজা, যা হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। দেশজুড়ে পূজামণ্ডপগুলোর বর্ণাঢ্য সাজসজ্জা এবং সরকারি পর্যায়ের বিশেষ নজরদারি উৎসবের আমেজকে করেছে আরও প্রাণবন্ত। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেও দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব।

নিরাপত্তা ও সরকারি ব্যবস্থাপনা

এ বছর সারা দেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ছিল ২৫৮টি মণ্ডপ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়া জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত ছিল। সীমান্তবর্তী আট কিলোমিটার এলাকার প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের সুরক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন করে বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি মণ্ডপে আটজন এবং অন্য মণ্ডপগুলোতে ছয়জন করে সদস্য মোতায়েন করা হয়।

ছুটি ও জনমনে স্বস্তি

সরকার উৎসবের সুবিধার্থে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। এর সাথে সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পান। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের আয়োজনে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ অনেকটাই কম ছিল। বিএনপি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই এই উৎসব বড় ধরনের বিঘ্ন ছাড়া সম্পন্ন হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে মত প্রকাশিত হয়েছে। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় বিশ্বাস। এর পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কার্যত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান সরকারি চাকরিজীবীরা। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, আগের বছরগুলোতে উৎসব ঘিরে যে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ ছিল, এবারের আয়োজন তার থেকে আলাদা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

পূজামণ্ডপের আলোকসজ্জা ও শৃঙ্খলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন প্রাণবন্ত দুর্গাপূজা এর আগে বিরল। এছাড়া ভারতীয় সাংবাদিক ও উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর স্থাপত্যশৈলী ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অগাস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যারা শংকিত ছিলেন, তাদের অনেকে এই আয়োজনকে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। ডেইলি ওয়াদার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের দুর্গাপূজার আয়োজনের প্রশংসা করেছেন লেখক, অধিকারকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। লেখক ও অধিকারকর্মী সাদিকুর রহমান খান, চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং লেখক ফাহাম আবদুস সালাম উৎসবের প্রশংসা করেছেন। কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের প্রশংসাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে তিনি নিয়মিত সরব ছিলেন। চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের জাঁকজমক দেখে আমি বিস্মিত।

চ্যালেঞ্জ ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বাধা

তবে এই সাফল্যের বিপরীতে কিছু উদ্বেগজনক তথ্যও সামনে এসেছে।

পূজা শুরুর আগে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার ৩৪টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে।

অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকার অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে এখনো কিছু ইসলামপন্থী বক্তা দুর্গাপূজাকে ‘হারাম’ বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে বড় বাধা। তার মতে, নিছক বড় আয়োজনের চেয়েও সারা বছর হিন্দুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সামনে হিন্দু ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা বড় একটি পরীক্ষা। তিনি সত্যিই ফিরলে হিন্দু ভোটারদের একটি অংশ বিএনপির কাছ থেকে আবার আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকবেন কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। ফলে আগামী নির্বাচনে হিন্দু ভোট ধরে রাখতে তারেক রহমানকে আরও বেশি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় একটি অংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল, কারণ আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে ছিল না।

তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং ছাত্রনেতাদের নতুন সংগঠন ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) কর্মকাণ্ড এই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে।

এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেয়া বক্তব্য বেশ আলোচনার সৃষ্টি করেছে; তিনি মন্দিরের বেহাত হওয়া প্রায় ৫ দশমিক ৬ একর জমি উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এদিকে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন। মন্দির কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে অবৈধভাবে দখল হওয়া মন্দিরের জমি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবেন। মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের নথিভুক্ত প্রায় আট একর জমির মধ্যে আনুমানিক ৫ দশমিক ৬ একর অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে।

সব মিলিয়ে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরণের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই এখন প্রধানমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।