
ইউরোপের বাজারে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে ভারত। দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং জানিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় ভারত এখন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘রিআর্ম ইউরোপ’ উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে ভারতের সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ইউরোপে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক হয়ে ওঠার দাবিটি রাজেশ কুমার সিংয়ের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। অস্ত্র রপ্তানিতে নতুন বাজারের সম্ভাবনা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত রেকর্ড পরিমাণ প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপি বা প্রায় ৩৬০ কোটি ইউরো।
বিশেষ করে কামানের গোলাসহ বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদ ও ছোট-বড় ক্যালিবারের অস্ত্র ইউরোপের বাজারে বেশ সমাদৃত হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপের দেশগুলো তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মজুত পুনর্গঠনে জোর দেওয়ায় ভারতের জন্য এই নতুন বাজার উন্মুক্ত হয়েছে।
গত দশ বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। এক সময় এ খাত মূলত ১৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, বর্তমানে প্রায় ৮৪০টি বেসরকারি কোম্পানি এবং ১৭ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে যুক্ত হয়েছে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভারত এখন ৮০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন ধরনের সামরিক পণ্য ও সরঞ্জাম রপ্তানি করছে। ১০ বছরে বিস্তৃত হয়েছে প্রতিরক্ষা শিল্প।
প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং জানান, ভারত তার বার্ষিক মূলধনি ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরাসরি দেশীয় নকশা ও প্রযুক্তিতে তৈরি সরঞ্জামের সক্ষমতা বাড়াবে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বছরে এ খাতে মূলধনি ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০০ কোটি মার্কিন ডলার নয়, বরং ২০০০ থেকে ২৫০০ কোটি মার্কিন ডলার—যার বড় অংশ দেশীয় উৎপাদন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার চেষ্টা করেছে দেশটি।
ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় উৎপাদন কার্যক্রম ভারতে সম্প্রসারণের আহ্বান জানানো হয়েছে। এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে নয়াদিল্লির। প্রতিরক্ষা সচিবের মতে, ইউরোপের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে তা ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
ইউরোপের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও ভারতীয় অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে কামানের ব্যবস্থা, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বড় বাজার তৈরি হচ্ছে এই অঞ্চলে। এক সময় রাশিয়া-নির্ভরতা বেশি থাকলেও, ভারত এখন ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক বহুমুখী করেছে।
তবে ইউরোপের বাজারে এই শক্তিশালী অবস্থান কতটুকু দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করছে পণ্যের গুণগত মান, সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর। ভারত বর্তমানে হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট থেকে শুরু করে জটিল কামানব্যবস্থাও বিশ্ববাজারে সফলভাবে পৌঁছে দিচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ অবস্থানের পেছনে নির্দিষ্ট সময়কাল, পণ্যের শ্রেণি ও দেশভিত্তিক রপ্তানির পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
পরিশেষে, আকাশবাণী নিউজ ও দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা আগামী দিনে দেশটির রপ্তানি আয়কে আরও সমৃদ্ধ করবে। সরকারের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিরক্ষা খাতে ভারত এখন শুধুমাত্র ভোক্তা নয়, বরং অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।





