১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভাবকে জয় করে অদ্বিতীয়া বৃত্তিতে স্বপ্নপূরণের পথে পাঁচ অদম্য মেধাবী

Published: November 1, 2026, 5:02 pm

অভাবের কষাঘাত আর শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা অদম্য মেধাবী তরুণীদের পাশে দাঁড়িয়েছে আইডিএলসি ও ট্রাস্ট। দরিদ্র পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী, যারা নানা বাধার মুখেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছেন, তাদের অনুপ্রাণিত করতে দেওয়া হয় ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। এই বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীরা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা করছেন, যেখানে তাদের আবাসন ও টিউশন ফি মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা হয়। সংসারে অভাব থাকলেও বাবা সব সময় স্বপ্ন দেখেছেন, আমি পড়ালেখা করব, বড় হব। তাঁর এই কষ্ট, তাঁর স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে আমাকেও প্রভাবিত করেছে। সব সময় ভেবেছি, একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবার কষ্ট দূর করব। সেখানেই এক সিনিয়র আপুর কাছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বৃত্তির খোঁজ পাই।

এই কার্যক্রমের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির সহযোগিতায় ১০১ জনসহ মোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছেন। এদের মধ্যে ৮৬ জনের স্নাতক সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা দেশে-বিদেশে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। চলতি বছর নতুন করে ১৫ জন মেধাবী এই বৃত্তি পেয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনের সংগ্রামী জীবনের গল্প এখানে উঠে এসেছে। ৮৬ জনের এরই মধ্যে স্নাতক শেষ হয়েছে।

শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানের এক শ্রমিকের সন্তান তার সংগ্রাম সম্পর্কে জানান, বাবার দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরিতে সংসার চললেও তিনি পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতেন। গাইড বই কেনার সামর্থ্য না থাকায় বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তে হতো। স্মার্টফোন না থাকায় ইউটিউব দেখে ক্লাস করে ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও ২০২৪ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পান তিনি। এখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়লেও পরিবারকে ছোট দুই বোনের পড়াশোনার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, যেখানে এই বৃত্তি বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের একটি ছোট্ট ঘরে আমার জন্ম। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। রেজাল্ট হয়তো খুব ভালো না; কিন্তু এর পেছনে যে কী সংগ্রাম ছিল, সেটা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি। পড়ুন তাঁদের মধ্যে ৫ জনের গল্প। প্রতিদিন ১৮৭ টাকা তাঁর মজুরি। তবে মা-বাবার ইচ্ছা ছিল, তাঁরা উচ্চশিক্ষা না পেলেও সন্তানদের শিক্ষিত করবেন। কখনো মাসে সাত হাজার টাকা আয় হতো, কখনো তার অর্ধেকেরও কম।

আরেক মেধাবীর ভাষ্য, বাবা কৃষক আর মা চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এমন দিনও গেছে, ক্ষুধা পেটে রাত কাটিয়েছি।

বাড়িতে সাতজনের সংসারের খরচ মেটানো মা-বাবার জন্য কঠিন।

নিয়মিত টাকা পাঠাতে না পারায় পড়ার পথে সংকট তৈরি হলেও বৃত্তি পাওয়ায় সেই চাপ কিছুটা লাঘব হবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া, জুমচাষি পরিবারের আরেক শিক্ষার্থী জানান, অভাবের কারণে অনেক সময় না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে ঢাকায় কাজ করতে হয়েছিল, কিন্তু পরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বৃত্তির সুযোগে তিনি আবার পড়াশোনায় ফিরেছেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ‘প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে’ কোর্সে পড়াশোনা করছেন। খাবার জোগাড় করতে অন্যের জুমেও কাজ করতে হয়।

অন্য এক শিক্ষার্থীর পারিবারিক পরিস্থিতির বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কিডনির রোগে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে গৃহিণী মা একাই সংসারের হাল ধরেছেন। ভাইয়ের পড়াশোনা আর নিজের খরচ জোগাতে মা হিমশিম খাচ্ছিলেন। অদ্বিতীয়া বৃত্তি পাওয়ায় তার হাতখরচের দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে। একইভাবে আরেক শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকে মা একা তিন ভাই-বোনকে বড় করেছেন। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে বড় হওয়া এই শিক্ষার্থী দ্বিতীয়বার প্রচেষ্টার পর বৃত্তিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতে অন্য অভাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আশা রাখেন। ২০২৩ সালে এসএসসিতে ও ২০২৫ সালে এইচএসসি পাস করি।

এই অদম্য মেধাবীদের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে যে, আর্থিক সংকট বা সামাজিক প্রতিকূলতা মেধাকে আটকে রাখতে পারে না। আইডিএলসি ও ট্রাস্টের এই উদ্যোগ তাদের উচ্চশিক্ষার পথকে সুগম করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার প্রেরণা জোগাচ্ছে।