
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের ইতিহাসে এবার নতুন এক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তা গত ২০ বছরের প্রেক্ষাপটে বেশ বিরল। সাধারণ সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি এতটা থাকে না, তবে এবার আগাম ভোটে নজিরবিহীন অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ভোটারদের এই বিপুল ক্রোধের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ইতিহাসে বহুবার অন্য দেশের নির্বাচন প্রকাশ্য বা গোপনে প্রভাবিত করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর আগ্রাসনে কোণঠাসা ইরান যখন হরমুজ প্রণালি খামচে ধরল, তখনই যুদ্ধের আসল ধাক্কা খেল বিশ্ব অর্থনীতি এবং সেই সুনামি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও আঘাত করল; যার পরিণতি আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। নির্বাচন নয়, যেন ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন রিপাবলিকানরা। এই নির্বাচনে তথাকথিত ‘ট্রাম্প-দশকের’ কফিনে পেরেক বসছে বটে, কিন্তু সেই শাস্তি ইরান বা গাজার ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশার সামান্যই মেটাতে পারবে। শ্বেতাঙ্গ নিচুতলায় তাঁর প্রতি এভাবেই গত এক দশকের মোহ কেটে গেছে। তাঁর মন্ত্রীদের কাজের তদন্ত করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের এই রায় যতটা না আদর্শিক, তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক হতাশা থেকে সৃষ্ট। কর্মসংস্থানের নাজুক অবস্থা এবং নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে সাধারণ মানুষ চরম অসুখী ছিল, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বাক্সে। এর আগে গত এক দশকে ট্রাম্প বেশ কিছু বিতর্কিত নীতিগত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন, যা তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। ভোটাররা এখন তাঁর ক্ষমতাচর্চায় লাগাম টানতে চেয়েছেন, যার ফলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বলা বাহুল্য, গত কয়েক মাসের জরিপগুলোও এটাই জানাচ্ছিল। এটা অতীতেরও অভিজ্ঞতা, আমেরিকার সাধারণ সমাজের গণতান্ত্রিক বুঝ এবং নির্বাচনী সংস্কৃতি সচরাচর যতটা অর্থনীতি ও সমাজের জীবনযুদ্ধকে গুরুত্ব দেয়—ততটা দেয় না জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিগত বিষয়কে। যদি প্রকৃতিই তাদের সংবিধানে লেখা গণতন্ত্রের মহান নীতিমালাকে ভোট দেওয়ার সময় তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত, তাহলে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জিততেন না এবং এবারও রিপাবলিকানদের পরাজয় হতো আরও ব্যাপক। ২০১৬ সাল থেকে গত এক দশকে ট্রাম্প শাস্তিযোগ্য অনেক নীতিগত অপকর্ম করেছেন। এমনকি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধেও রায় নয় এটা। ভোটাররা মনে করেছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তগুলো তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনকে বিবেচনায় নিয়ে নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ তাতে অবহেলিত বোধ করেছে। নিজেদের প্রেসিডেন্টের হাতে-পায়ে শিকল পরাতে চেয়েছেন তাঁরা এবং সেটা ভালোভাবেই হবে।
ইরানের সামরিক কৌশল ও কৌশলগত পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা এবারের নির্বাচনী ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির শিরোনামেই উঠে এসেছে—‘মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের প্রধান কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
যুদ্ধ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ ও সামাজিক খাত থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
এর বড় প্রমাণ কানসাসের ফলাফল, যেখানে ১৯৩২ সালের পর প্রথমবারের মতো একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। জনজীবনে যুদ্ধ কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তার বড় প্রমাণ কানসাসে ১৯৩২–এর পর এই প্রথম একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হলেন।
ট্রাম্পের এই বিপর্যয়ে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সিনেট ও হাউসে ডেমোক্র্যাটদের শক্ত অবস্থানে ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ এবং রক্ষণশীলদের প্রাধান্য দেওয়া অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপে এখন বড় ধরনের বাধা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও অস্ত্র বেচাকেনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সংসদীয় কমিটিগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়বে।
নির্বাচনের এই ফলাফলে ডেমোক্র্যাট দলের অভ্যন্তরীণ শক্তি বিন্যাসেও পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লড়াই করা এবং সামাজিক সুরক্ষা ইস্যুতে সোচ্চার প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের জয় তাদের দলে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। মিশিগানে আবদুল আল-সাইদের জয় এর অন্যতম বড় উদাহরণ, যা দলটির অভ্যন্তরে স্বাস্থ্যনীতি ও ইসরায়েল ইস্যুতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সাফল্য দুই বছর পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বাড়তি আশাবাদ জোগাচ্ছে।
দোদুল্যমান রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে জর্জিয়ায় আফ্রিকান-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমসের জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসের অন্যতম বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপুল অর্থবিত্তের অধিকারী রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে তাঁর এই বিজয় প্রগতিশীল রাজনীতির সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। এই ফলাফল ইউরোপের দেশগুলোতে ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত আন্দোলনকারীদের জন্যও আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। রিপাবলিকান অনেক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও আটকানো যাবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মতে, আমেরিকার জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প যদি যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন, তবে তা হবে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম মনে হলেও, এই নির্বাচন বিশ্বরাজনীতি ও মার্কিন বৈদেশিক নীতির মোকাবিলায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দুই বছরে ট্রাম্প তাঁর শাসনামলে এই জনমতকে কতটা গুরুত্ব দেন।





